🖌 সমালোচনার তোড়ে ভেসে গেল আবুল মালের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট !… ১৪ দল এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বাজেট সংশোধনের কথা বলছেন !

প্রস্তাবিত বাজেটকে বড় বাজেট বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এই বাজেটে কোনও সমস্যা থাকলে সংসদে আলোচনা করে তার সমাধান করা হবে।’ রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।

‘আওয়ামী লীগের পায়ের নিচে মাটি নেই’ মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষমতার উচ্চশিখরে আরোহণ করে যে দলের জন্ম হয়, তাদের পায়ের নিচে মাটি থাকে না। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম। এদেশের মাটি আর মানুষের ভেতর থেকে আওয়ামী লীগ উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের মুক্তি এনে দিয়েছে, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আরোহণ করে রাজনীতিতে অবতরণ করা বিএনপি মাটি ও মানুষের থেকে জন্ম নেয়নি। ’
বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা মানুষ পুড়িয়েছে, মানুষ পোড়াতে হুকুম দিয়েছে, হুকুমদাতাসহ সবার বিচার হবে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার মামলা ডিলে করার জন্য ১৪৬ বার আদালত বদল করেছেন। ভয়টা কিসের মামলা ফেইস করার?’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাই।

৯ম ওয়েজবোর্ডের কার্যক্রম চলছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘এখন আটকে আছে মালিকদের কারণে। মালিকদের প্রতিনিধি দেওয়ার কথা, তারা দেননি। তারা প্রতিনিধি দিলে কাজটা শুরু করে দিতে পারি। মালিকরা সদস্য দেবেন, সুপারিশ দেবেন। আমি চাই প্রত্যেক মালিক ওয়েজবোর্ড মেনে চলবেন। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াও ওয়েজবোর্ডে সামিল হওয়া উচিত। এটা না ঘরকা না ঘাটকা।’

নীতিহীন রাজনীতি দেশ ও জাতির কল্যাণ করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলতেন, রাজনীতি করলে নীতির সঙ্গে করতে হবে, সাংবাদিকতায়ও নীতি থাকতে হবে। নীতিহীন সাংবাদিকতায় দেশ-সমাজ কলুষিত হয়, তাতে দেশ ও জাতির ক্ষতি।’

আগে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হতো উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন গ্রেফতারের আগে সমন জারি হয়। সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা সমধানে উত্তরায় প্লট নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি দিয়ে তারা প্লট নিতে পারবেন। আমি গণপূর্তমন্ত্রীকে বলেছি, কিছু প্লট আলাদা করে রেখে দিতে।’

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ওমর ফারুক প্রমুখ ডিউইজের সভাপতি শাবান মাহমুদ।

ফরহাদ মজহারের বিশ্লেষণ ঃ 

তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাটা বিলাতে রাজার বিরুদ্ধে ইংলিশম্যানরা বলেছে সেই কবে সতেরো শতাব্দিতে। বিলাতের শাসন থেকে মার্কিন রাজ্যগুলো যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করল তখন নির্ধারক রণধ্বণি ছিল এই কথাই ‘নো ট্যাক্সেশান উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’। পার্লামেন্টে যদি আমার অথবা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকে তাহলে সেই পার্লামেন্টে পেশ করা ট্যাক্স আমরা দেবো না। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এইসব অতি গোড়ার কথা। অ তে অজগর জাতীয় বর্ণমালা পরিচয়ের মতো। বিলাত থেকে যদি সংদীয় গণতন্ত্র আমাদানি করেন তো খোলসটা আনলেন কেন? মর্মটা কোথায় ফালাইয়া আসলেন?

কিন্তু আপনি যে এতো গণতন্ত্র, সংসদীয় পদ্ধতি ইত্যাদি বলে মুখে ফেনা তোলেন, আপনি কি এটা জানেন বা জানতেন? প্রতিনিধিত্ব না থাকলে পার্লামেন্টের ট্যাক্স আরোপের কোন বৈধতা নাই। আপনি দিতে বাধ্য নন। ঐতিহাসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। নইলে গণতন্ত্রের কথা বলবেন না। ডাকাতরা তখন রাষ্ট্র, পার্লামেন্ট ইত্যাদি হাইকোর্ট দেখিয়ে তাদের লুটতরাজ ও ডাকাতি অব্যাহত রাখবে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। হুঁশে আসুন।

এখন আপনি আবুল আল আবদুল মোহিত সাহেবকে কি বলতে পারবেন যে আপনারে ট্যাক্স দিমু না কারণ আপনারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না। যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই। কেন নাই? আপনি ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। অথচ কথায় কথায় ব্যক্তিগিরি ফলান। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। শোষিত হলে পোষা কুকুর ছানার মতো মনিবের কোলে গাঁইগুঁই করেন কিন্তু ব্যাক্তি চেতনা ও আপনার ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নাই । ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য এখনও বহুত দূরের ব্যাপার, অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়িয়ে যাচ্ছেন। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তো দূরের কথা, শহুরে মধ্যবিত্ত সুলভ বুর্জোয়া চেতনার অধিকারও হতে পারেন নি,

অথচ চেতনাবাজি করে বেড়াচ্ছেন!

যান ছোলা খান গিয়া। বাজেট নিয়া কথা বলতে গিয়ে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না
বাজেটের পরিসংখ্যান নিয়ে তর্কাতর্কি পরে করুন। গণিত পরে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেবেন না। সহজ করে ভাবুন, যাতে সাধারন মানুষ সহজ ভাবে ট্যাক্স ব্যাপারটা কী এবং অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মোহিত চাইলেই সে রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য কিনা বুঝতে পারে। রাষ্ট্র আপনার কাছ নানান ধরনের খাজনা নিচ্ছে। কেন নিচ্ছে? কারন রাষ্ট্রের খর্চাখরচ আছে। যেমন, পুলিশ-র্যা ব-সেনাবাহিনী-আমলাদের বেতন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের বেতন, রাস্তাঘাট তৈরিতে খরচ, বড় বড় প্রকল্পের জন্য খরচ, ইত্যাদি । তো ঠিক আছে। এটা তো মোগল আমলে রাজরাজড়াও নিতো, তাই না? ইংরেজ আমলে নিতো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। তারপর নিতেন বিলাতের রাণি। বিলাতের রাণি ঔপনিবেশিক শাসন বলবৎ রাখার জন্য। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ নেটিভদের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অর্থের জোগানের জন্য খাজনা বা ট্যাক্স। আপনার আয় দিয়ে আপনাকে ঔপনিবেশিক শৃংখলে বেঁধে রাখা হোত, বিলাতি শাসন চালানোর অর্থ জোগান হোত। কী সুন্দর ব্যবস্থা! কিন্তু এখন? মোঘলাই কিম্বা ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কি?

আপনার ট্যাক্স নিয়ে এক শ্রেণীর বড়লোককে আরো ধনি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনিকি পাকিস্তান বা ঔপনিবেশিক আমলেও এটা হয় নি। লর্ড ক্লাইভের আমলে দেশের সামগ্রিক আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিও এভাবে লুন্ঠন ও শোষণ করে নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যেভাবে অল্প কিছু ব্যাক্তি ও পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার তুলনা ইতিহাসে আছে কিনা সন্দেহ।

বাংলাদেশ কি তাহলে মোঘলদের মনসবদারি? লর্ড ক্লাইভের নতুন কর্পোরেট সামাজ্য? পাকিস্তানের দুই অর্থ নীতির অর্থনৈতিক অসাম্য? আমরা নাকি বাইশ পরিবারের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি? এখন কয় পরিবার আমাদের নির্বিঘ্নে লুটতরাজ করছে? আপনি দেখছেন, নিয়মিত লুট হচ্ছে ব্যাংক। এটা দুই একটি ব্যাংকের দুর্নীতি না। এমন এক ব্যাংক ব্যবস্থাই এই রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠেছে যাতে লুটতরাজ ও ডাকাতি সহজ হয়। এমনকি ব্যাংক আইনও বদলানো হচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেটা এমনই যে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও ডিজিটাল কায়দায় লুট হয়েছে। তাহলে ট্যাক্স নিয়ে প্রাথমিক তর্ক হচ্ছে, ঘটনা কী আসলে?

সেটা বুঝতে হলে বোঝা দরকার পুরানা সামন্ত বা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কি তফাৎ? আমরা দেখতে পারছি রাষ্ট্র স্রেফ ডাকাতদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়, তাহলে তারা ট্যাক্স দাবি করলেই আমর দিচ্ছি কেন? তাদের ট্যাক্স আরোপের বৈধতা কোঠায়? এটাই এখনকার প্রশ্ন। সামন্ত বা মোঘলাই শাসন ব্যবস্থায় রাজা মাত্রই বৈধ, তার অস্রো র জোরই আপনার কাছ থেকে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আদায় করার বৈধতা। আপনাকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে বলে আপনি তাকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতেন। ঔপনিবেশিক আমলও চরিত্রের দিক থেকে এই ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিক বল প্রয়োগের ক্ষমতাই এই ক্ষেত্রে বৈধতা। ইংরেজ অস্ত্র ও বারুদের জোরে আপনার প্রভু হয়েই এসেছে; আপনি পরাজিত, বিজিতের অধীন এবং বাইরের শক্তি দ্বারা শাসিত। অতএব আপনি ইংরেজকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খাজনা। শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধতা তাহলে কি দ্বারা নির্ণয় করা হয়?

‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ব্যক্তির আবির্ভাব

ইউরোপে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই সামনে চলে এসেছিল। ট্যাক্স নেবার বৈধ অধিকারী কে? রাষ্ট্র? কিন্তু কি ধরনের রাষ্ট্র? এই প্রশ্নটা জারি রাখলে আমরা রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের বৈপ্লবিক পর্বটা বুঝব। বুঝব সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নতুন গড়ে ওঠা ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কী ধরণের শ্লোগান তুলছে ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কার্যকর করছে। সেটা বুঝলে আধুনিক গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত তার মর্ম আমরা ধরতে পারব। রাষ্ট্রের ন্যূনতম যে চরিত্র না থাকলে গণতন্ত্রে আপনি রাষ্ট্রকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য না, অন্তত পক্ষে সেটা বুঝবেন। ইংলণ্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবার খুবই গোড়ার জায়গা সেটা। অর্থাৎ বুঝতে হবে পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ কোন্‌ অধিকারে জনগণের ওপর ট্যাক্স আরোপ, আদায় ও খরচ করতে পারে? আধুনিক রাষ্ট্র তো রাজতন্ত্র নয়, যে রাজার দৈবশক্তির বলেই রাজা ট্যাক্স বসাতে পারেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ তো আল্লার তরফে নাজিল হওয়া ফেরেশতাদের সভা নয়। আধুনিক রাষ্ট্র তাহলে কোন্‌ অধিকারে ট্যাক্স দাবি করে? কোথা থেকে জাতীয় সংসদ এই শক্তি পায়? এই শক্তির বৈধতা কি? এটা বোঝা বাংলাদেশে আমাদের জন্য খুবই জরুরী। এগুলো অতিশয় গোড়ার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্রের বর্ণপরিচয় শিক্ষার অ তে অজগর স্তরের ব্যাপার। এটা বুঝতে পারলে আধুনিক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাও আমরা বুঝব।

বামপন্থিদের লেখালিখিতে বাংলাভাষায় ‘বুর্জোয়া’ ধনিদের গালি দেবার ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সমাজ ও রাজনীতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হিসাবে নয়। সে কারণে বামপন্থিরা ‘ধনিক শ্রেণি’ আর ‘বুর্জোয়া’ পালাটা পালটি করে ব্যবহার করতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। বোঝার উপায় নাই ধনি মানেই বুর্জোয়া আর বুর্জোয়া মানেই ধনি কিনা। ধনি কথাটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝায়। সে বুর্জোয়া চেতনার ধারক নাকি ধারক নয় সেটা ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দ্বারা বোঝা যায়, তার অর্থনৈতিক অবস্থান দ্বারা না। তবে ধরে নেওয়া হয় যে ধনি পরিবারের সন্তান ধনি শ্রেণির চেতনাই সাধারণত ধারণ করে। কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নাই, শ্রমিকেরা শ্রমিক বলেই শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শ ধারণ করে এই প্রকার রোমান্টিক ধারণা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি শুরু করার শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। বুর্জোয়া সমাজে শ্রমিকের চেতনা বুর্জোয়া চিন্তাচেতনা দ্বারাই প্রভাবিত থেকে; তাদের ওপর রাজনৈতিক আন্দোলন ছেড়ে দিলে তারা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়ন অবধি যেতে পারে, আর পারে না, এটা বুঝেই লেনিন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা কাজের ওপর নির্ভর করেন নি। তিনি চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিতে কৌশলে ইতিহাস সচেতন অগ্রসর রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে তার নানান কারন আছে। কিন্তু বলশেভিক বিপ্লব একটি সফল রাজনৈতিক বিপ্লব। যার মধ্য দিয়ে ‘জারতন্ত্রের পতন ঘটেছি। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান এটা মানে যে প্রাক বুর্জোয়া সমাজে যারা নিদেন পক্ষে বুর্জোয়া চেতনা বিরোধী ক্ষমতাসীনদের বৈপ্লবিক কায়দায় উৎখাত করে নিজেদের শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে চায় তারা লেনিনের বৈপ্লবিক নীতি ও কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ না করে সফল হতে পারবে না। বিশেষত সমাজের তর্ক বিতর্কে কিভাবে বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা ব্যাক্ত হচ্ছে, কিভাবে তাকে আমলে নিতে হয় এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় আশু কর্তব্য কিভাবে স্পষ্ট ভাবে নির্ধারন করতে হয়, কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর নিজেদের চিন্তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রচার চালাতে হয় — ইত্যাদি শিক্ষা লেনিন ছাড়া এখনও দেবার মতো ঐতিহাসিক কোন ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটে নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যার্থ বটে, কিন্তু লেনিনের কাছ থেকে শিক্ষা না নিয়ে বৈপ্লবিক রাজনীতি একালেও অসম্ভব প্রকল্প।

বলশেভিক লেনিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে বুর্জোয়া চেতনাকে যথাযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেন নি; ব্যক্তির চেতনাগত বিকাশ ছাড়া ওপর থেকে ডিক্রি জারি করে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্র দিয়ে গায়ের জোরে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করবার চেষ্টা করেছিলেন। ‘বুর্জোয়া চেতনা’ – বিশেষত নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তি ভাবা, এবং ব্যক্তি হিসাবে সমষ্টির চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আমার নিজের ব্যক্তি অধিকারকে আর সব কিছুর ওপর স্থান দেওয়া ইতিহাসের বিশেষ একটা পর্ব। যা হাওয়াই কায়দায়, কিম্বা বল প্রয়োগ করে অতিক্রম করা যায় না। চেতনাগত বিকাশের লড়াই কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই। শুধু উৎপাদন ব্যবাস্তা বা উৎপাদন সম্পর্ক বদলিয়ে কিম্বা শুধু অন্ন বাস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করলে সে লড়াইয়ে জেতা যায় না। বহু ব্যার্থতার পর ইতিহাস থেকে মানুষএই শিক্ষা টুকু নিতে চাইছে যে মানুষ স্রেফ জীবমাত্র নয়, তার ব্যাক্তি ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে কিভাবে সমষ্টির অভিপ্রায়ে রূপান্তর করা যায় সেটা ইতিহাসের বাস্তব সমস্যা হিসাবে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাজির হয়েছে। বিপ্লবের পুরানা চিন্তা দিয়ে আর কাজ হবে না।

যে কেউই ধনি কিম্বা গরিব হতেই পারে, কিন্তু বুর্জোয়া হওয়া না হওয়া তার নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনাগত ব্যাপার। সামন্ত ব্যবস্থা ও সামন্ত সংস্কৃতির বিপরীতে ব্যক্তির স্বাধীন কর্তাসত্তা ও অধিকারবোধ ইতিহাসে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে সেটা আমরা ইউরোপে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর ইতিহাস বা সরল ভাষায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করলে দেখি। সেখানে জন্মসূত্রে সমাজে অভিজাতদের শাসন মেনে নেবার বিরুদ্ধে বুর্জোয়া তার নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তি অধিকারের জন্য লড়ে। দাবি তোলে — কার জন্ম কিভাবে হোল, কে অভিজাত কে নিম্ন বর্গ, কে ধনি কে গরিব সেটা বিবেচনার বিষয় না। মানুষ মাত্রই এক, তাই তারা সমান। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যক্তির ঐতিহাসিক আবির্ভাবকে নিশ্চিত করে।

বুর্জোয়া মতবাদ তাই ব্যক্তিতান্ত্রিক, কিন্তু সাম্যবাদী মতবাদ। ব্যাক্তি হিসাবে আমি আর তুমি এক, আমরা সমান, তাই জন্মের আভিজাত্য কিম্বা অর্থনৈতিক অবস্থা দ্বারা আমরা কে ছোট কে বড় ঠিক হবে না; বরং রাজনৈতিক পরিসর ও রাষ্ট্রে ছখে আমরা এক এবং আমাদের অধিকারও সমান। সম্পত্তিতে ব্যক্তি অধিকার বা ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বুর্জোয়া সমাজ রক্ষা করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যেই ব্যাক্তি তার নিজের ব্যক্তিত্বের চরিতার্থতা নিশ্চিত করতে চায়। এই মায়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন ব্যাপার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কেউ ধনি কিম্বা গরিব হতে পা্রে, কিম্বা অভিজাত কিম্বা নিম্নবর্গ, কিম্বা, বাংলাদেশের কথা ভেবে বলা যায় হতে পারে হিন্দু-মুসললমান-আস্তিক-নাস্তিক, ইত্যাদি — কিন্তু সমাজে সকলের জন্য সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে –যেমন, রাষ্ট্র গঠন, শাসন ব্যবস্থা নির্ণয়, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা সকল ক্ষেত্রেই — আমাদের সকলেরই একই অধিকার। ব্যক্তিই এখানে সার্বভৌম কোন রাজা, কিম্বা অভিজাত নন। এমনকি সমাজও নয়। সমাজ চাইলেই ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবির্ভাবের এটাই রাজনৈতিক চেতনাগত ভিত্তি। একেই আধুনিক কালে নাগরিক ও মানবিক অধিকার বলে থাকে। ব্যক্তির এই ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। তাহলে ভাবা দরকার, আমাদের সমাজে ব্যক্তির এই অধিকার বোধ বা রাজনৈতিক সচেতনতার আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা আবির্ভাব ঘটলেও তাকে আমরা কতোটা লেনিনের মতো আমলে নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করবার কাজে এগিয়ে নিতে পেরেছি। নাকি সমাজতন্ত্রের নামে আমরা উলটা প্রতিক্রিয়াশীল কাজে ব্যস্ত রয়েছি?

বুর্জোয়া বা সাম্যবাদী সমাজ আর কমিউনিজম অবশ্য এক কথা নয়। সমাজ বা সমষ্টির ধারণা ছাড়া ব্যক্তির অধিকার কথাটার কোন অর্থ হয় না। এখানেই কার্ল মার্কসের গুরুত্ব। ব্যক্তি আকাশে বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একা একা বাস করে না। ব্যক্তির অধিকার অতএব সমষ্টির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। সেই সম্বন্ধের চরিত্র উৎপাদন সম্পর্ক যেমন নির্ণয় করে, তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের অভিঘাত থেকে জাত আইনের দ্বারাও নির্দিষ্ট। স্বাধীন ‘ব্যাক্তি’ একটি হাওয়াই ফানুশ, ঘোড়ার ডিমও বলা যায়। ব্যক্তি অতএব পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক দ্বারা হোক কিম্বা হোক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইন উভয়েরই পরাধীনি। সমষ্টি তখন পুঁজি এবং আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত কিম্বা রাষ্ট্রের বিলয় ঘটলেই কমিউনিজম কায়েম হবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। তখন ব্যাকি আর সমাজের সম্বন্ধ কিভাবে নির্ণীত হবে সেটা নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসাবে নতুন পরিস্থিতিতে হাজির হয়ে যাবে। কমিউনিজম গড়তে হোল এমন এক ‘উম্মাহ’ গড়তে হবে যেখানে ব্যক্তি নিজেই তারা সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার দ্বারা উপলব্ধি করে যে সমাজেই তার মুক্তি, সমাজের মধ্যেই তার বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব। তার স্বাধীনতা সমাজের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে হবে, সমাজের বাইরে নয়। কমিউনিজম এই উপলব্ধির সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিণতির অধিক কিছু নয়।

মানুষের সমাজের বাইরে কারুরই একা একা বিকশিত হবার কোন সুযোগ নাই। এই উপলব্ধির রাজনীতি সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের জায়গাগুলো ব্যাক্তির কাছে স্পষ্ট করে তোলে। ব্যক্তি অধিকার হরণ করে যেমন কমিউনিজম গঠন করা যায় না, তেমনি সমাজ, উম্মাহ বা সামষ্টিকতার বিপরীতে ব্যক্তির অধিকারকে সার্বভৌম গণ্য করলে সমাজ টেঁকে না। আমরা দেখেছি, ডিক্রি জারি করে সমাজতন্ত্র গড়বার পরীক্ষা ইতিহাসে ব্যার্থ হয়েছে, কিন্তু তাই বলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই থেমে নাই। কারণ এটাই মানবেতিহাসের শেষ গন্তব্য নয়। ব্যক্তির ‘আধ্যাত্মিক’ অর্থাৎ মানুষের চিত্তবৃত্তি, চিন্তাচেতনা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব নিরসন করে ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণতন্ত্রে ধনিগরিব ছোটবড় নির্বিশেষে সকলের একটাই ভোট, এটাও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায় ইতিহাস তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজার বিরুদ্ধে ব্যক্তির আবির্ভাব কিভাবে ঘটছিল, কিভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছিল এবং কিভাবে ব্যক্তি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আদায় করে নিয়েছিলো সেইসব বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে সেটা আমরা কিভাবে বুঝব? কিম্বা সেই সচেতনতার মাত্রা বা চরিত্র নির্ণয়ের উপায় কি? সেটা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চিন্তা সমাজে উঠছে কিনা, উঠলে কিভাবে উঠছে এবং তার মীমাংসা সমাজ কিভাবে করতে চাইছে ইত্যাদির বিচার। সম্বন্ধ নির্ণয়ের তর্ক বিতর্ক ও মীমাংসার প্রস্তাবনা দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণি ও গোষ্ঠি এবং নারীকুল ও পুরুষকুলকেও আমরা শনাক্ত করতে পারি।

ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল কিনা কিম্বা ঘটলে তার চরিত্র কেমন সেটা খানিক বুঝব রাষ্ট্র যখন আমাদের ওপর খাজনা বা ট্যাক্স আরোপ করে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা। দেখা যায় প্রতিক্রিয়া হয় এত্তো ট্যাক্স এবার? করের বোঝা কত বাড়ল সেটাই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর এক পক্ষ সরকারের সমালোচনা, আরেকপক্ষ সরকারের পক্ষে সাফাই গায়, ইত্যাদি। ট্যাক্স কম না বেশি সেই তর্ক ‘রাজনৈতিক’ নয় – অর্থাৎ এর দ্বারা সমাজে ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা ঘটলেও তার বিকাশের মাত্রা কেমন তার কিছুই আমরা বুঝব না।

কিন্তু ব্যাক্তির বিকাশ কতোটুকু ঘটেছে সেটা একটি মাত্র প্রশ্ন তোলার হিম্মত দেখে বেশ ভাল ভাবেই বোঝা যায়। সেটা হোল যারা করারোপ করছে তারা খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধ কর্তা কিনা? কিভাবে তারা তাদের বৈধতা নিশ্চিত করেছে? আমরা মোঘলাই শাসন, লর্ড ক্লাইভের অধীনস্থ দেওয়ানি কিম্বা ইংরেজের দ্বারা শাসিত প্রজা নই। আমরা যদি স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে থাকি তাহলে এই ক্ষেত্রে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কে যে আমার ওপর খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করছ? তোমার বৈধতা কি?

তুমি নির্বাচিত না তোমারে ট্যাক্স দেবো না

ইংলণ্ডে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে যখন বুর্জোয়া শ্রেণি গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল তখন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান উঠেছিল, সেটা হোল ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’; যদি আমরা তোমাকে নির্বাচিত না করে থাকি তাহলে আমাদের কাছ থেকে খাজনা বা ট্যাক্স নেবার কোন অধিকার কিম্বা বৈধতা তোমার নাই। তুমি নির্বাচিত না হলে তোমাকে খাজনা বা ট্যাক্স দেবো না। বাংলাদেশে কিন্তু আমরা এই বাস্তবতার মধ্যেই এখন নিপতিত হয়েছি। যারা সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে আসেন নি জনগণের ওপর ট্যাক্স বা খাজনা আরোপ করবার কোন অধিকার বা বৈধতা তাদের নাই। এটা গণতন্ত্রের একদমই গোড়ার কথা: নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেসেন্টেশান। আমরা যদি তোমাদের নির্বাচিত না করে থাকি আমরা তোমাদের ট্যাক্স দিতে বাধ্য নই।

তিনটি স্তরে এর মানে আছে। এক হচ্ছে বৈধতার প্রশ্ন, বর্তমান জাতীয় সংসদকে যদি জনগণ নির্বাচিত না করে থাকে তাহলে ক্ষমতাসীনদের আরোপ করা ট্যাক্স জনগণ দিতে বাধ্য না। আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের ট্যাক্স আরোপ করারা বৈধতার এটাই ভিত্তি। দ্বিতীয় মানে হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কিভাবে খরচ হয়েছে তার জবাদিহিতা নিশ্চিত করবার উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থাকা চাই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু নাই, অর্থাৎ জাতীয় সংসদে জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা নাই। রাষ্ট্রের আর কোন প্রতিষ্ঠান নাই যার দ্বারা ডাকাতি ও লুন্ঠনের অর্থের জন্য ক্ষমতাসীনদের আমরা জবাবদিহি করতে পারি। তৃতীয় মানে হচ্ছে ট্যাক্স আরোপ করে রাজস্ব খাতে জমা হওয়া টাকা কিভাবে খরচ করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জনগণের অংশ গ্রহণের অধিকার। সেটাও অনুপস্থিত। অতএব ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোর ডাকাতদের মতো ট্যাক্স নিতে পারে বটে, তবে তা স্রেফ ডাকাতি হবে। এর সঙ্গে গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রের কোন সম্বন্ধ নাই। রাষ্ট্র অল্পকিছু ব্যক্তি বা পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ডাকাতদের হাতে চলে গিয়েছে।

ইংরেজদের ১৬৮৯সালের অধিকারের সনদ (English Bill of Rights 1689) সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোন ট্যাক্স আরোপ করা যাবে না সেই বিধি প্রবর্তন করে। প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবোনা এই দাবি প্রবল ভাবে ওঠে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংলণ্ড থেকে যাওয়া সেটলারদের। তারা বলল বৃটিশ পার্লামেন্টে আমাদের কোন রিপ্রেজেন্টেশান নাই, কোন প্রতিনিধিত্ব নাই। তাহলে একজন ইংলিশম্যানের যে অধিকার (Rights of Englishmen) সেটা আমাদের ক্ষেত্রে লংঘিত হচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাবি করে তাদের ‘ভার্চুয়াল রিপ্রেজেন্টেশান’ আছে, কিন্তু সেটলাররা তা মানে নি। তারা বলল, যদি পার্লামেন্টে আমাদের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকে তাহলে আমরা ব্রিটেনকে কোন ট্যাক্স দেব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বীজ এই প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ট্যাক্স নাই দাবির ওপর গড়ে ওঠে।

তাহলে ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দাবি। ব্যক্তির বিকাশের মাত্রা নির্ণয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হোক কিম্বা হোক জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম – প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবো না – সব সময়ই কোন না কোন ভাবে উত্থাপিত হয়ই। হতে বাধ্য। মনে রাখা দরকার ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘স্বাধীনতার ইশতাহার’ ঘোষণা করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর তিনটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়: বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ, বৈষম্যের নিরসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সেখানে আন্দোলনের ধারা হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হয়। তাহলে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেবার ইতিহাস আমাদের মুক্তযুদ্ধেরই ইতিহাস। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে এই দাবি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের তুঙ্গ মুহূর্তে মাসাচুসেটস থেকে ১৭৬৪ সালে জেমস অটিস জুনিয়র লিখছেন, ম্যাগনা চার্টারের অধিকার বলে নিজের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্তে বা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে পার্লামেন্টে একজন ব্রিটিশ যে ট্যাক্স দিতে কবুল করে, তার বাইরে অন্য কোন ট্যাক্স দেবার দায় থেকে সে মুক্ত। এই অধিকার যদি ম্যাগনা চার্টার অধিকারের অতিরিক্ত না হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই একজন ব্রিটিশের জন্মগত অধিকার, এই অধিকার ব্রিটিশ কমন ল’য়ের অন্তর্গত। আমি পুরা ইংরেজি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি।

When the parliament shall think fit to allow the colonists a representation in the house of commons, the equity of their taxing the colonies, will be as clear as their power is at present of doing it without, if they please…But if it was thought hard that charter privileges should be taken away by act of parliament, is it not much harder to be in part, or in whole, disfranchised of rights, that have been always thought inherent to a British subject, namely, to be free from all taxes, but what he consents to in person, or by his representative? This right, if it could be traced no higher than Magna Charta, is part of the common law, part of a British subjects birthright, and as inherent and perpetual, as the duty of allegiance; both which have been brought to these colonies, and have been hitherto held sacred and inviolable, and I hope and trust ever will. It is humbly conceived, that the British colonists (except only the conquered, if any) are, by Magna Charta, as well entitled to have a voice in their taxes, as the subjects within the realm. Are we not as really deprived of that right, by the parliament assessing us before we are represented in the house of commons, as if the King should do it by his prerogative? Can it be said with any colour of truth or justice, that we are represented in parliament? (In 1764, the Massachusetts politician James Otis, Jr.) ।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, গণতন্ত্রের কথা বলতে মুখে ফেনা তুলি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খুবই গোড়ার ব্যাপার – যার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াত – আমরা এভাবেই উপেক্ষা করি। গণতন্ত্রে আপনি যদি পার্লামেন্টে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না পাঠাতে পারেন, রাষ্ট্র যদি তা নিশ্চিত করতে না পারে, সেই পার্লামেন্টের বাজেট অবৈধ। তার ট্যাক্স বসাবার, আদায় করবার বা খরচ করবার কোন নৈতিক কিম্বা বৈধ অধিকার নাই।

সবার আগে তাহলে এই কথাটাই বোঝা দরকার। তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাতা বলতে পারা ঐতিয়াসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বলতে পারবেন? যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই, অতএব ব্যক্তিগিরি ফলাবেন না। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। আপনি শোষিত হলে গাঁইগুঁই করেন বটে, কিন্তু ব্যক্তি চেতনা ও ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা নাই। আপনি কথায় কথায় ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনও ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য বহুত দূরের ব্যাপার, কমিউনিস্ট হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়ান।

যান ছোলা খান। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

🖌 ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ – ফরহাদ মজহার

তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাটা বিলাতে রাজার বিরুদ্ধে ইংলিশম্যানরা বলেছে সেই কবে সতেরো শতাব্দিতে। বিলাতের শাসন থেকে মার্কিন রাজ্যগুলো যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করল তখন নির্ধারক রণধ্বণি ছিল এই কথাই ‘নো ট্যাক্সেশান উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’। পার্লামেন্টে যদি আমার অথবা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকে তাহলে সেই পার্লামেন্টে পেশ করা ট্যাক্স আমরা দেবো না। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এইসব অতি গোড়ার কথা। অ তে অজগর জাতীয় বর্ণমালা পরিচয়ের মতো। বিলাত থেকে যদি সংদীয় গণতন্ত্র আমাদানি করেন তো খোলসটা আনলেন কেন? মর্মটা কোথায় ফালাইয়া আসলেন?

কিন্তু আপনি যে এতো গণতন্ত্র, সংসদীয় পদ্ধতি ইত্যাদি বলে মুখে ফেনা তোলেন, আপনি কি এটা জানেন বা জানতেন? প্রতিনিধিত্ব না থাকলে পার্লামেন্টের ট্যাক্স আরোপের কোন বৈধতা নাই। আপনি দিতে বাধ্য নন। ঐতিহাসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। নইলে গণতন্ত্রের কথা বলবেন না। ডাকাতরা তখন রাষ্ট্র, পার্লামেন্ট ইত্যাদি হাইকোর্ট দেখিয়ে তাদের লুটতরাজ ও ডাকাতি অব্যাহত রাখবে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। হুঁশে আসুন।

এখন আপনি আবুল আল আবদুল মোহিত সাহেবকে কি বলতে পারবেন যে আপনারে ট্যাক্স দিমু না কারণ আপনারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না। যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই। কেন নাই? আপনি ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। অথচ কথায় কথায় ব্যক্তিগিরি ফলান। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। শোষিত হলে পোষা কুকুর ছানার মতো মনিবের কোলে গাঁইগুঁই করেন কিন্তু ব্যাক্তি চেতনা ও আপনার ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নাই । ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য এখনও বহুত দূরের ব্যাপার, অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়িয়ে যাচ্ছেন। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তো দূরের কথা, শহুরে মধ্যবিত্ত সুলভ বুর্জোয়া চেতনার অধিকারও হতে পারেন নি,

অথচ চেতনাবাজি করে বেড়াচ্ছেন!

যান ছোলা খান গিয়া। বাজেট নিয়া কথা বলতে গিয়ে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না
বাজেটের পরিসংখ্যান নিয়ে তর্কাতর্কি পরে করুন। গণিত পরে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেবেন না। সহজ করে ভাবুন, যাতে সাধারন মানুষ সহজ ভাবে ট্যাক্স ব্যাপারটা কী এবং অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মোহিত চাইলেই সে রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য কিনা বুঝতে পারে। রাষ্ট্র আপনার কাছ নানান ধরনের খাজনা নিচ্ছে। কেন নিচ্ছে? কারন রাষ্ট্রের খর্চাখরচ আছে। যেমন, পুলিশ-র্যা ব-সেনাবাহিনী-আমলাদের বেতন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের বেতন, রাস্তাঘাট তৈরিতে খরচ, বড় বড় প্রকল্পের জন্য খরচ, ইত্যাদি । তো ঠিক আছে। এটা তো মোগল আমলে রাজরাজড়াও নিতো, তাই না? ইংরেজ আমলে নিতো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। তারপর নিতেন বিলাতের রাণি। বিলাতের রাণি ঔপনিবেশিক শাসন বলবৎ রাখার জন্য। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ নেটিভদের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অর্থের জোগানের জন্য খাজনা বা ট্যাক্স। আপনার আয় দিয়ে আপনাকে ঔপনিবেশিক শৃংখলে বেঁধে রাখা হোত, বিলাতি শাসন চালানোর অর্থ জোগান হোত। কী সুন্দর ব্যবস্থা! কিন্তু এখন? মোঘলাই কিম্বা ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কি?

আপনার ট্যাক্স নিয়ে এক শ্রেণীর বড়লোককে আরো ধনি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনিকি পাকিস্তান বা ঔপনিবেশিক আমলেও এটা হয় নি। লর্ড ক্লাইভের আমলে দেশের সামগ্রিক আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিও এভাবে লুন্ঠন ও শোষণ করে নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যেভাবে অল্প কিছু ব্যাক্তি ও পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার তুলনা ইতিহাসে আছে কিনা সন্দেহ।

বাংলাদেশ কি তাহলে মোঘলদের মনসবদারি? লর্ড ক্লাইভের নতুন কর্পোরেট সামাজ্য? পাকিস্তানের দুই অর্থ নীতির অর্থনৈতিক অসাম্য? আমরা নাকি বাইশ পরিবারের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি? এখন কয় পরিবার আমাদের নির্বিঘ্নে লুটতরাজ করছে? আপনি দেখছেন, নিয়মিত লুট হচ্ছে ব্যাংক। এটা দুই একটি ব্যাংকের দুর্নীতি না। এমন এক ব্যাংক ব্যবস্থাই এই রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠেছে যাতে লুটতরাজ ও ডাকাতি সহজ হয়। এমনকি ব্যাংক আইনও বদলানো হচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেটা এমনই যে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও ডিজিটাল কায়দায় লুট হয়েছে। তাহলে ট্যাক্স নিয়ে প্রাথমিক তর্ক হচ্ছে, ঘটনা কী আসলে?

সেটা বুঝতে হলে বোঝা দরকার পুরানা সামন্ত বা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কি তফাৎ? আমরা দেখতে পারছি রাষ্ট্র স্রেফ ডাকাতদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়, তাহলে তারা ট্যাক্স দাবি করলেই আমর দিচ্ছি কেন? তাদের ট্যাক্স আরোপের বৈধতা কোঠায়? এটাই এখনকার প্রশ্ন। সামন্ত বা মোঘলাই শাসন ব্যবস্থায় রাজা মাত্রই বৈধ, তার অস্রো র জোরই আপনার কাছ থেকে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আদায় করার বৈধতা। আপনাকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে বলে আপনি তাকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতেন। ঔপনিবেশিক আমলও চরিত্রের দিক থেকে এই ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিক বল প্রয়োগের ক্ষমতাই এই ক্ষেত্রে বৈধতা। ইংরেজ অস্ত্র ও বারুদের জোরে আপনার প্রভু হয়েই এসেছে; আপনি পরাজিত, বিজিতের অধীন এবং বাইরের শক্তি দ্বারা শাসিত। অতএব আপনি ইংরেজকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খাজনা। শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধতা তাহলে কি দ্বারা নির্ণয় করা হয়?

‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ব্যক্তির আবির্ভাব

ইউরোপে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই সামনে চলে এসেছিল। ট্যাক্স নেবার বৈধ অধিকারী কে? রাষ্ট্র? কিন্তু কি ধরনের রাষ্ট্র? এই প্রশ্নটা জারি রাখলে আমরা রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের বৈপ্লবিক পর্বটা বুঝব। বুঝব সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নতুন গড়ে ওঠা ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কী ধরণের শ্লোগান তুলছে ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কার্যকর করছে। সেটা বুঝলে আধুনিক গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত তার মর্ম আমরা ধরতে পারব। রাষ্ট্রের ন্যূনতম যে চরিত্র না থাকলে গণতন্ত্রে আপনি রাষ্ট্রকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য না, অন্তত পক্ষে সেটা বুঝবেন। ইংলণ্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবার খুবই গোড়ার জায়গা সেটা। অর্থাৎ বুঝতে হবে পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ কোন্‌ অধিকারে জনগণের ওপর ট্যাক্স আরোপ, আদায় ও খরচ করতে পারে? আধুনিক রাষ্ট্র তো রাজতন্ত্র নয়, যে রাজার দৈবশক্তির বলেই রাজা ট্যাক্স বসাতে পারেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ তো আল্লার তরফে নাজিল হওয়া ফেরেশতাদের সভা নয়। আধুনিক রাষ্ট্র তাহলে কোন্‌ অধিকারে ট্যাক্স দাবি করে? কোথা থেকে জাতীয় সংসদ এই শক্তি পায়? এই শক্তির বৈধতা কি? এটা বোঝা বাংলাদেশে আমাদের জন্য খুবই জরুরী। এগুলো অতিশয় গোড়ার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্রের বর্ণপরিচয় শিক্ষার অ তে অজগর স্তরের ব্যাপার। এটা বুঝতে পারলে আধুনিক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাও আমরা বুঝব।

বামপন্থিদের লেখালিখিতে বাংলাভাষায় ‘বুর্জোয়া’ ধনিদের গালি দেবার ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সমাজ ও রাজনীতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হিসাবে নয়। সে কারণে বামপন্থিরা ‘ধনিক শ্রেণি’ আর ‘বুর্জোয়া’ পালাটা পালটি করে ব্যবহার করতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। বোঝার উপায় নাই ধনি মানেই বুর্জোয়া আর বুর্জোয়া মানেই ধনি কিনা। ধনি কথাটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝায়। সে বুর্জোয়া চেতনার ধারক নাকি ধারক নয় সেটা ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দ্বারা বোঝা যায়, তার অর্থনৈতিক অবস্থান দ্বারা না। তবে ধরে নেওয়া হয় যে ধনি পরিবারের সন্তান ধনি শ্রেণির চেতনাই সাধারণত ধারণ করে। কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নাই, শ্রমিকেরা শ্রমিক বলেই শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শ ধারণ করে এই প্রকার রোমান্টিক ধারণা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি শুরু করার শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। বুর্জোয়া সমাজে শ্রমিকের চেতনা বুর্জোয়া চিন্তাচেতনা দ্বারাই প্রভাবিত থেকে; তাদের ওপর রাজনৈতিক আন্দোলন ছেড়ে দিলে তারা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়ন অবধি যেতে পারে, আর পারে না, এটা বুঝেই লেনিন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা কাজের ওপর নির্ভর করেন নি। তিনি চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিতে কৌশলে ইতিহাস সচেতন অগ্রসর রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে তার নানান কারন আছে। কিন্তু বলশেভিক বিপ্লব একটি সফল রাজনৈতিক বিপ্লব। যার মধ্য দিয়ে ‘জারতন্ত্রের পতন ঘটেছি। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান এটা মানে যে প্রাক বুর্জোয়া সমাজে যারা নিদেন পক্ষে বুর্জোয়া চেতনা বিরোধী ক্ষমতাসীনদের বৈপ্লবিক কায়দায় উৎখাত করে নিজেদের শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে চায় তারা লেনিনের বৈপ্লবিক নীতি ও কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ না করে সফল হতে পারবে না। বিশেষত সমাজের তর্ক বিতর্কে কিভাবে বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা ব্যাক্ত হচ্ছে, কিভাবে তাকে আমলে নিতে হয় এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় আশু কর্তব্য কিভাবে স্পষ্ট ভাবে নির্ধারন করতে হয়, কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর নিজেদের চিন্তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রচার চালাতে হয় — ইত্যাদি শিক্ষা লেনিন ছাড়া এখনও দেবার মতো ঐতিহাসিক কোন ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটে নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যার্থ বটে, কিন্তু লেনিনের কাছ থেকে শিক্ষা না নিয়ে বৈপ্লবিক রাজনীতি একালেও অসম্ভব প্রকল্প।

 বলশেভিক লেনিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে বুর্জোয়া চেতনাকে যথাযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেন নি; ব্যক্তির চেতনাগত বিকাশ ছাড়া ওপর থেকে ডিক্রি জারি করে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্র দিয়ে গায়ের জোরে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করবার চেষ্টা করেছিলেন। ‘বুর্জোয়া চেতনা’ – বিশেষত নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তি ভাবা, এবং ব্যক্তি হিসাবে সমষ্টির চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আমার নিজের ব্যক্তি অধিকারকে আর সব কিছুর ওপর স্থান দেওয়া ইতিহাসের বিশেষ একটা পর্ব। যা হাওয়াই কায়দায়, কিম্বা বল প্রয়োগ করে অতিক্রম করা যায় না। চেতনাগত বিকাশের লড়াই কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই। শুধু উৎপাদন ব্যবাস্তা বা উৎপাদন সম্পর্ক বদলিয়ে কিম্বা শুধু অন্ন বাস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করলে সে লড়াইয়ে জেতা যায় না। বহু ব্যার্থতার পর ইতিহাস থেকে মানুষএই শিক্ষা টুকু নিতে চাইছে যে মানুষ স্রেফ জীবমাত্র নয়, তার ব্যাক্তি ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে কিভাবে সমষ্টির অভিপ্রায়ে রূপান্তর করা যায় সেটা ইতিহাসের বাস্তব সমস্যা হিসাবে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাজির হয়েছে। বিপ্লবের পুরানা চিন্তা দিয়ে আর কাজ হবে না।

যে কেউই ধনি কিম্বা গরিব হতেই পারে, কিন্তু বুর্জোয়া হওয়া না হওয়া তার নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনাগত ব্যাপার। সামন্ত ব্যবস্থা ও সামন্ত সংস্কৃতির বিপরীতে ব্যক্তির স্বাধীন কর্তাসত্তা ও অধিকারবোধ ইতিহাসে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে সেটা আমরা ইউরোপে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর ইতিহাস বা সরল ভাষায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করলে দেখি। সেখানে জন্মসূত্রে সমাজে অভিজাতদের শাসন মেনে নেবার বিরুদ্ধে বুর্জোয়া তার নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তি অধিকারের জন্য লড়ে। দাবি তোলে — কার জন্ম কিভাবে হোল, কে অভিজাত কে নিম্ন বর্গ, কে ধনি কে গরিব সেটা বিবেচনার বিষয় না। মানুষ মাত্রই এক, তাই তারা সমান। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যক্তির ঐতিহাসিক আবির্ভাবকে নিশ্চিত করে।

বুর্জোয়া মতবাদ তাই ব্যক্তিতান্ত্রিক, কিন্তু সাম্যবাদী মতবাদ। ব্যাক্তি হিসাবে আমি আর তুমি এক, আমরা সমান, তাই জন্মের আভিজাত্য কিম্বা অর্থনৈতিক অবস্থা দ্বারা আমরা কে ছোট কে বড় ঠিক হবে না; বরং রাজনৈতিক পরিসর ও রাষ্ট্রে ছখে আমরা এক এবং আমাদের অধিকারও সমান। সম্পত্তিতে ব্যক্তি অধিকার বা ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বুর্জোয়া সমাজ রক্ষা করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যেই ব্যাক্তি তার নিজের ব্যক্তিত্বের চরিতার্থতা নিশ্চিত করতে চায়। এই মায়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন ব্যাপার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কেউ ধনি কিম্বা গরিব হতে পা্রে, কিম্বা অভিজাত কিম্বা নিম্নবর্গ, কিম্বা, বাংলাদেশের কথা ভেবে বলা যায় হতে পারে হিন্দু-মুসললমান-আস্তিক-নাস্তিক, ইত্যাদি — কিন্তু সমাজে সকলের জন্য সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে –যেমন, রাষ্ট্র গঠন, শাসন ব্যবস্থা নির্ণয়, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা সকল ক্ষেত্রেই — আমাদের সকলেরই একই অধিকার। ব্যক্তিই এখানে সার্বভৌম কোন রাজা, কিম্বা অভিজাত নন। এমনকি সমাজও নয়। সমাজ চাইলেই ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবির্ভাবের এটাই রাজনৈতিক চেতনাগত ভিত্তি। একেই আধুনিক কালে নাগরিক ও মানবিক অধিকার বলে থাকে। ব্যক্তির এই ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। তাহলে ভাবা দরকার, আমাদের সমাজে ব্যক্তির এই অধিকার বোধ বা রাজনৈতিক সচেতনতার আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা আবির্ভাব ঘটলেও তাকে আমরা কতোটা লেনিনের মতো আমলে নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করবার কাজে এগিয়ে নিতে পেরেছি। নাকি সমাজতন্ত্রের নামে আমরা উলটা প্রতিক্রিয়াশীল কাজে ব্যস্ত রয়েছি?

বুর্জোয়া বা সাম্যবাদী সমাজ আর কমিউনিজম অবশ্য এক কথা নয়। সমাজ বা সমষ্টির ধারণা ছাড়া ব্যক্তির অধিকার কথাটার কোন অর্থ হয় না। এখানেই কার্ল মার্কসের গুরুত্ব। ব্যক্তি আকাশে বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একা একা বাস করে না। ব্যক্তির অধিকার অতএব সমষ্টির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। সেই সম্বন্ধের চরিত্র উৎপাদন সম্পর্ক যেমন নির্ণয় করে, তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের অভিঘাত থেকে জাত আইনের দ্বারাও নির্দিষ্ট। স্বাধীন ‘ব্যাক্তি’ একটি হাওয়াই ফানুশ, ঘোড়ার ডিমও বলা যায়। ব্যক্তি অতএব পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক দ্বারা হোক কিম্বা হোক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইন উভয়েরই পরাধীনি। সমষ্টি তখন পুঁজি এবং আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত কিম্বা রাষ্ট্রের বিলয় ঘটলেই কমিউনিজম কায়েম হবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। তখন ব্যাকি আর সমাজের সম্বন্ধ কিভাবে নির্ণীত হবে সেটা নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসাবে নতুন পরিস্থিতিতে হাজির হয়ে যাবে। কমিউনিজম গড়তে হোল এমন এক ‘উম্মাহ’ গড়তে হবে যেখানে ব্যক্তি নিজেই তারা সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার দ্বারা উপলব্ধি করে যে সমাজেই তার মুক্তি, সমাজের মধ্যেই তার বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব। তার স্বাধীনতা সমাজের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে হবে, সমাজের বাইরে নয়। কমিউনিজম এই উপলব্ধির সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিণতির অধিক কিছু নয়।

মানুষের সমাজের বাইরে কারুরই একা একা বিকশিত হবার কোন সুযোগ নাই। এই উপলব্ধির রাজনীতি সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের জায়গাগুলো ব্যাক্তির কাছে স্পষ্ট করে তোলে। ব্যক্তি অধিকার হরণ করে যেমন কমিউনিজম গঠন করা যায় না, তেমনি সমাজ, উম্মাহ বা সামষ্টিকতার বিপরীতে ব্যক্তির অধিকারকে সার্বভৌম গণ্য করলে সমাজ টেঁকে না। আমরা দেখেছি, ডিক্রি জারি করে সমাজতন্ত্র গড়বার পরীক্ষা ইতিহাসে ব্যার্থ হয়েছে, কিন্তু তাই বলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই থেমে নাই। কারণ এটাই মানবেতিহাসের শেষ গন্তব্য নয়। ব্যক্তির ‘আধ্যাত্মিক’ অর্থাৎ মানুষের চিত্তবৃত্তি, চিন্তাচেতনা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব নিরসন করে ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণতন্ত্রে ধনিগরিব ছোটবড় নির্বিশেষে সকলের একটাই ভোট, এটাও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায় ইতিহাস তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজার বিরুদ্ধে ব্যক্তির আবির্ভাব কিভাবে ঘটছিল, কিভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছিল এবং কিভাবে ব্যক্তি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আদায় করে নিয়েছিলো সেইসব বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে সেটা আমরা কিভাবে বুঝব? কিম্বা সেই সচেতনতার মাত্রা বা চরিত্র নির্ণয়ের উপায় কি? সেটা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চিন্তা সমাজে উঠছে কিনা, উঠলে কিভাবে উঠছে এবং তার মীমাংসা সমাজ কিভাবে করতে চাইছে ইত্যাদির বিচার। সম্বন্ধ নির্ণয়ের তর্ক বিতর্ক ও মীমাংসার প্রস্তাবনা দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণি ও গোষ্ঠি এবং নারীকুল ও পুরুষকুলকেও আমরা শনাক্ত করতে পারি।

ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল কিনা কিম্বা ঘটলে তার চরিত্র কেমন সেটা খানিক বুঝব রাষ্ট্র যখন আমাদের ওপর খাজনা বা ট্যাক্স আরোপ করে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা। দেখা যায় প্রতিক্রিয়া হয় এত্তো ট্যাক্স এবার? করের বোঝা কত বাড়ল সেটাই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর এক পক্ষ সরকারের সমালোচনা, আরেকপক্ষ সরকারের পক্ষে সাফাই গায়, ইত্যাদি। ট্যাক্স কম না বেশি সেই তর্ক ‘রাজনৈতিক’ নয় – অর্থাৎ এর দ্বারা সমাজে ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা ঘটলেও তার বিকাশের মাত্রা কেমন তার কিছুই আমরা বুঝব না।

কিন্তু ব্যাক্তির বিকাশ কতোটুকু ঘটেছে সেটা একটি মাত্র প্রশ্ন তোলার হিম্মত দেখে বেশ ভাল ভাবেই বোঝা যায়। সেটা হোল যারা করারোপ করছে তারা খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধ কর্তা কিনা? কিভাবে তারা তাদের বৈধতা নিশ্চিত করেছে? আমরা মোঘলাই শাসন, লর্ড ক্লাইভের অধীনস্থ দেওয়ানি কিম্বা ইংরেজের দ্বারা শাসিত প্রজা নই। আমরা যদি স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে থাকি তাহলে এই ক্ষেত্রে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কে যে আমার ওপর খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করছ? তোমার বৈধতা কি?

তুমি নির্বাচিত না তোমারে ট্যাক্স দেবো না

ইংলণ্ডে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে যখন বুর্জোয়া শ্রেণি গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল তখন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান উঠেছিল, সেটা হোল ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’; যদি আমরা তোমাকে নির্বাচিত না করে থাকি তাহলে আমাদের কাছ থেকে খাজনা বা ট্যাক্স নেবার কোন অধিকার কিম্বা বৈধতা তোমার নাই। তুমি নির্বাচিত না হলে তোমাকে খাজনা বা ট্যাক্স দেবো না। বাংলাদেশে কিন্তু আমরা এই বাস্তবতার মধ্যেই এখন নিপতিত হয়েছি। যারা সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে আসেন নি জনগণের ওপর ট্যাক্স বা খাজনা আরোপ করবার কোন অধিকার বা বৈধতা তাদের নাই। এটা গণতন্ত্রের একদমই গোড়ার কথা: নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেসেন্টেশান। আমরা যদি তোমাদের নির্বাচিত না করে থাকি আমরা তোমাদের ট্যাক্স দিতে বাধ্য নই।

তিনটি স্তরে এর মানে আছে। এক হচ্ছে বৈধতার প্রশ্ন, বর্তমান জাতীয় সংসদকে যদি জনগণ নির্বাচিত না করে থাকে তাহলে ক্ষমতাসীনদের আরোপ করা ট্যাক্স জনগণ দিতে বাধ্য না। আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের ট্যাক্স আরোপ করারা বৈধতার এটাই ভিত্তি। দ্বিতীয় মানে হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কিভাবে খরচ হয়েছে তার জবাদিহিতা নিশ্চিত করবার উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থাকা চাই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু নাই, অর্থাৎ জাতীয় সংসদে জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা নাই। রাষ্ট্রের আর কোন প্রতিষ্ঠান নাই যার দ্বারা ডাকাতি ও লুন্ঠনের অর্থের জন্য ক্ষমতাসীনদের আমরা জবাবদিহি করতে পারি। তৃতীয় মানে হচ্ছে ট্যাক্স আরোপ করে রাজস্ব খাতে জমা হওয়া টাকা কিভাবে খরচ করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জনগণের অংশ গ্রহণের অধিকার। সেটাও অনুপস্থিত। অতএব ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোর ডাকাতদের মতো ট্যাক্স নিতে পারে বটে, তবে তা স্রেফ ডাকাতি হবে। এর সঙ্গে গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রের কোন সম্বন্ধ নাই। রাষ্ট্র অল্পকিছু ব্যক্তি বা পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ডাকাতদের হাতে চলে গিয়েছে।

ইংরেজদের ১৬৮৯সালের অধিকারের সনদ (English Bill of Rights 1689) সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোন ট্যাক্স আরোপ করা যাবে না সেই বিধি প্রবর্তন করে। প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবোনা এই দাবি প্রবল ভাবে ওঠে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংলণ্ড থেকে যাওয়া সেটলারদের। তারা বলল বৃটিশ পার্লামেন্টে আমাদের কোন রিপ্রেজেন্টেশান নাই, কোন প্রতিনিধিত্ব নাই। তাহলে একজন ইংলিশম্যানের যে অধিকার (Rights of Englishmen) সেটা আমাদের ক্ষেত্রে লংঘিত হচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাবি করে তাদের ‘ভার্চুয়াল রিপ্রেজেন্টেশান’ আছে, কিন্তু সেটলাররা তা মানে নি। তারা বলল, যদি পার্লামেন্টে আমাদের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকে তাহলে আমরা ব্রিটেনকে কোন ট্যাক্স দেব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বীজ এই প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ট্যাক্স নাই দাবির ওপর গড়ে ওঠে।

তাহলে ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দাবি। ব্যক্তির বিকাশের মাত্রা নির্ণয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হোক কিম্বা হোক জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম – প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবো না – সব সময়ই কোন না কোন ভাবে উত্থাপিত হয়ই। হতে বাধ্য। মনে রাখা দরকার ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘স্বাধীনতার ইশতাহার’ ঘোষণা করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর তিনটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়: বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ, বৈষম্যের নিরসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সেখানে আন্দোলনের ধারা হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হয়। তাহলে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেবার ইতিহাস আমাদের মুক্তযুদ্ধেরই ইতিহাস। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে এই দাবি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের তুঙ্গ মুহূর্তে মাসাচুসেটস থেকে ১৭৬৪ সালে জেমস অটিস জুনিয়র লিখছেন, ম্যাগনা চার্টারের অধিকার বলে নিজের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্তে বা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে পার্লামেন্টে একজন ব্রিটিশ যে ট্যাক্স দিতে কবুল করে, তার বাইরে অন্য কোন ট্যাক্স দেবার দায় থেকে সে মুক্ত। এই অধিকার যদি ম্যাগনা চার্টার অধিকারের অতিরিক্ত না হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই একজন ব্রিটিশের জন্মগত অধিকার, এই অধিকার ব্রিটিশ কমন ল’য়ের অন্তর্গত। আমি পুরা ইংরেজি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি।

When the parliament shall think fit to allow the colonists a representation in the house of commons, the equity of their taxing the colonies, will be as clear as their power is at present of doing it without, if they please…But if it was thought hard that charter privileges should be taken away by act of parliament, is it not much harder to be in part, or in whole, disfranchised of rights, that have been always thought inherent to a British subject, namely, to be free from all taxes, but what he consents to in person, or by his representative? This right, if it could be traced no higher than Magna Charta, is part of the common law, part of a British subjects birthright, and as inherent and perpetual, as the duty of allegiance; both which have been brought to these colonies, and have been hitherto held sacred and inviolable, and I hope and trust ever will. It is humbly conceived, that the British colonists (except only the conquered, if any) are, by Magna Charta, as well entitled to have a voice in their taxes, as the subjects within the realm. Are we not as really deprived of that right, by the parliament assessing us before we are represented in the house of commons, as if the King should do it by his prerogative? Can it be said with any colour of truth or justice, that we are represented in parliament? (In 1764, the Massachusetts politician James Otis, Jr.) ।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, গণতন্ত্রের কথা বলতে মুখে ফেনা তুলি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খুবই গোড়ার ব্যাপার – যার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াত – আমরা এভাবেই উপেক্ষা করি। গণতন্ত্রে আপনি যদি পার্লামেন্টে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না পাঠাতে পারেন, রাষ্ট্র যদি তা নিশ্চিত করতে না পারে, সেই পার্লামেন্টের বাজেট অবৈধ। তার ট্যাক্স বসাবার, আদায় করবার বা খরচ করবার কোন নৈতিক কিম্বা বৈধ অধিকার নাই।

সবার আগে তাহলে এই কথাটাই বোঝা দরকার। তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাতা বলতে পারা ঐতিয়াসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বলতে পারবেন? যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই, অতএব ব্যক্তিগিরি ফলাবেন না। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। আপনি শোষিত হলে গাঁইগুঁই করেন বটে, কিন্তু ব্যক্তি চেতনা ও ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা নাই। আপনি কথায় কথায় ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনও ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য বহুত দূরের ব্যাপার, কমিউনিস্ট হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়ান।

যান ছোলা খান।  ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২ জুন ২০১৭। শ্যামলী।

🖌 জনপ্রতিনিধিদের সম্মানীভাতা বৃদ্ধি

184445govt_kalerkantho_picসিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের সম্মানীভাতা সরকার বৃদ্ধি করেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সম্মানীভাতা বৃদ্ধি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ আজ এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

আগামী ১ জুলাই থেকে এই বর্ধিত সুবিধা কার্যকর হবে।
সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের মাসিক সম্মানী ৮৫ হাজার টাকা ও কাউন্সিলর ৩৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে অন্যান্য ভাতাদি আগের মতোই বহাল থাকবে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মাসিক সম্মানী ৫৪ হাজার টাকা ও আপ্যায়ন ৫ হাজার টাকা, সদস্যদের মাসিক সম্মানী ভাতা ৩৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
ক শ্রেণীর পৌরসভা মেয়রের ৩৮ হাজার টাকা ও কাউন্সিলর ৮ হাজার টাকা, খ শ্রেণীর পৌরসভা মেয়রের ২৮ হাজার টাকা ও কাউন্সিলরের ৭ হাজার টাকা, গ শ্রেণীর পৌরসভা মেয়রের ২৪ হাজার টাকা ও কাউন্সিলরের ৬ হাজার টাকা মাসিক সম্মানী পাবেন।
এছাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাসিক সম্মানী ৪০ হাজার টাকা ও ভাইস চেয়ারম্যান ২৭ হাজার টাকা সম্মানী পাবেন। তবে অন্যান্য ভাতাদি আগের মতোই বহাল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সরকারি অংশ ৩ হাজার ৬শ’ টাকা ও ইউপি অংশ ৪ হাজার ৪শ’ টাকাসহ মোট ৮ হাজার টাকা, সদস্য সরকারি অংশ ২ হাজার ৩৭৫ টাকা ও ইউপি অংশ ২ হাজার ৬২৫ টাকাসহ মোট ৫ হাজার টাকা মাসিক সম্মানী পাবেন।

অনলাইন পত্রিকার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ে নেই

enu-parlament20161004190910-1অনলাইন ভিত্তিক পত্রিকার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তথ্য মন্ত্রণালয়ে নেই বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। মঙ্গলবার নূরজাহান বেগম এমপির (মহিলা আসনে-৪২) এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় ‘অনলাইন গণমাধ্যমে নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি প্রণীত হলে সব অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম বাধ্যতামূলক নিবন্ধন কার্যক্রমের আওতায় আসবে। তখন অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে।

মন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তিনটি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অনুমোদনপ্রাপ্ত ৪১টি টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্যে ২৬টি সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ১৩টি চ্যানেল সম্প্রচারের অপেক্ষায়।

চট্টগ্রাম-১১ আসনের এম আবদুল লতিফ এমপির অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, গত ৮ বছরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কোনো পূর্ণাঙ্গ স্টেশন স্থাপন করা হয়নি। তবে বিটিভিকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কর্তৃক বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক মানসম্পন্ন টেলিভিশন কেন্দ্র পরিচালনার লক্ষ্যে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন, ডিজিটাল আর্কাইভ স্থাপন, অনলাইন গ্রাফিক্স, আধুনিক সংবাদ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনসহ সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মর্ডানাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন অ্যান্ড অটোমেশন অব বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্ট্রাল সিস্টেম’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে নাশকতার শঙ্কা ।| নিরাপত্তায় ‘বিশেষ বাহিনী’ গঠনের সুপারিশ

উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিবন্ধক জঙ্গিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে নাশকতা ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংসদীয় কমিটি। একই শঙ্কা বিরাজ করছে গ্যাস ক্ষেত্রগুলো নিয়েও। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি  হামলার পর রাজধানীর কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ মেলায় এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র  বৈঠকে এমন আশঙ্কা প্রকাশ হয়। কমিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী’ গঠন ও সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।

কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, মো. আতিউর রহমান আতিক, মো. আবু জাহির, এম. আবদুল লতিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন (নাছিম) এবং এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার অংশ নেন। জ্বালানী বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী, বিপিসি এর চেয়ারম্যান মাহমুদ রেজা খান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সংসদ সচিবালয় জানায়, বৈঠকে পায়রা বন্দরকে অধিক কার্যকর করার লক্ষ্যে ১৮ কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার সুপারিশ করা হয়। কমিটি দেশে উত্পাদিত এলপিজি গ্যাস ও আমদানীকৃত এলপিজি গ্যাসের মূল্য এক এবং সঠিক মাপ ও মান নিশ্চিত করার সুপারিশ করে। এছাড়া বেসরকারি গ্যাস কোম্পানীগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করে।
বৈঠকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা অব্যাহত রাখা এবং যেখানে যে কোম্পানির গ্যাস সংযোগ আছে সেখানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের জন্য সে কোম্পানিকে দায়ী করে শাস্তি প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

Be SPONSORED Now                                                           ।|                                                     Be SPONSORED By
994845_222113644606426_1372751799_n (1)
icon_03330f6935bcffa1c31e43d9b18d34c5
২৮ জুলাই, ২০১৬
নামাজের সময়সূচি   
ফজর ভোর ৩:৪৪ মিনিট
জোহর বেলা ১১:৫৯ মিনিট
আসর বিকেল ৪:৩৬ মিনিট
মাগরিব সন্ধ্যা ৬:৪৭ মিনিট
ইশা রাত ৮:১০ মিনিট
আগামীকালের সূর্যোদয়
ভোর ৫:১১ মিনিট
আজ সূর্যাস্ত
সন্ধ্যা ৬:৪৭ মিনিট