🖌 সমালোচনার তোড়ে ভেসে গেল আবুল মালের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট !… ১৪ দল এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বাজেট সংশোধনের কথা বলছেন !

প্রস্তাবিত বাজেটকে বড় বাজেট বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এই বাজেটে কোনও সমস্যা থাকলে সংসদে আলোচনা করে তার সমাধান করা হবে।’ রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন।

‘আওয়ামী লীগের পায়ের নিচে মাটি নেই’ মন্তব্য করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষমতার উচ্চশিখরে আরোহণ করে যে দলের জন্ম হয়, তাদের পায়ের নিচে মাটি থাকে না। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম। এদেশের মাটি আর মানুষের ভেতর থেকে আওয়ামী লীগ উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের মুক্তি এনে দিয়েছে, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আরোহণ করে রাজনীতিতে অবতরণ করা বিএনপি মাটি ও মানুষের থেকে জন্ম নেয়নি। ’
বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা মানুষ পুড়িয়েছে, মানুষ পোড়াতে হুকুম দিয়েছে, হুকুমদাতাসহ সবার বিচার হবে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার মামলা ডিলে করার জন্য ১৪৬ বার আদালত বদল করেছেন। ভয়টা কিসের মামলা ফেইস করার?’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাই।

৯ম ওয়েজবোর্ডের কার্যক্রম চলছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘এখন আটকে আছে মালিকদের কারণে। মালিকদের প্রতিনিধি দেওয়ার কথা, তারা দেননি। তারা প্রতিনিধি দিলে কাজটা শুরু করে দিতে পারি। মালিকরা সদস্য দেবেন, সুপারিশ দেবেন। আমি চাই প্রত্যেক মালিক ওয়েজবোর্ড মেনে চলবেন। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াও ওয়েজবোর্ডে সামিল হওয়া উচিত। এটা না ঘরকা না ঘাটকা।’

নীতিহীন রাজনীতি দেশ ও জাতির কল্যাণ করতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলতেন, রাজনীতি করলে নীতির সঙ্গে করতে হবে, সাংবাদিকতায়ও নীতি থাকতে হবে। নীতিহীন সাংবাদিকতায় দেশ-সমাজ কলুষিত হয়, তাতে দেশ ও জাতির ক্ষতি।’

আগে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হতো উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন গ্রেফতারের আগে সমন জারি হয়। সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা সমধানে উত্তরায় প্লট নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি দিয়ে তারা প্লট নিতে পারবেন। আমি গণপূর্তমন্ত্রীকে বলেছি, কিছু প্লট আলাদা করে রেখে দিতে।’

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিএফইউজের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, মহাসচিব ওমর ফারুক প্রমুখ ডিউইজের সভাপতি শাবান মাহমুদ।

ফরহাদ মজহারের বিশ্লেষণ ঃ 

তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাটা বিলাতে রাজার বিরুদ্ধে ইংলিশম্যানরা বলেছে সেই কবে সতেরো শতাব্দিতে। বিলাতের শাসন থেকে মার্কিন রাজ্যগুলো যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করল তখন নির্ধারক রণধ্বণি ছিল এই কথাই ‘নো ট্যাক্সেশান উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’। পার্লামেন্টে যদি আমার অথবা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকে তাহলে সেই পার্লামেন্টে পেশ করা ট্যাক্স আমরা দেবো না। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এইসব অতি গোড়ার কথা। অ তে অজগর জাতীয় বর্ণমালা পরিচয়ের মতো। বিলাত থেকে যদি সংদীয় গণতন্ত্র আমাদানি করেন তো খোলসটা আনলেন কেন? মর্মটা কোথায় ফালাইয়া আসলেন?

কিন্তু আপনি যে এতো গণতন্ত্র, সংসদীয় পদ্ধতি ইত্যাদি বলে মুখে ফেনা তোলেন, আপনি কি এটা জানেন বা জানতেন? প্রতিনিধিত্ব না থাকলে পার্লামেন্টের ট্যাক্স আরোপের কোন বৈধতা নাই। আপনি দিতে বাধ্য নন। ঐতিহাসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। নইলে গণতন্ত্রের কথা বলবেন না। ডাকাতরা তখন রাষ্ট্র, পার্লামেন্ট ইত্যাদি হাইকোর্ট দেখিয়ে তাদের লুটতরাজ ও ডাকাতি অব্যাহত রাখবে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। হুঁশে আসুন।

এখন আপনি আবুল আল আবদুল মোহিত সাহেবকে কি বলতে পারবেন যে আপনারে ট্যাক্স দিমু না কারণ আপনারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না। যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই। কেন নাই? আপনি ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। অথচ কথায় কথায় ব্যক্তিগিরি ফলান। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। শোষিত হলে পোষা কুকুর ছানার মতো মনিবের কোলে গাঁইগুঁই করেন কিন্তু ব্যাক্তি চেতনা ও আপনার ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নাই । ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য এখনও বহুত দূরের ব্যাপার, অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়িয়ে যাচ্ছেন। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তো দূরের কথা, শহুরে মধ্যবিত্ত সুলভ বুর্জোয়া চেতনার অধিকারও হতে পারেন নি,

অথচ চেতনাবাজি করে বেড়াচ্ছেন!

যান ছোলা খান গিয়া। বাজেট নিয়া কথা বলতে গিয়ে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না
বাজেটের পরিসংখ্যান নিয়ে তর্কাতর্কি পরে করুন। গণিত পরে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেবেন না। সহজ করে ভাবুন, যাতে সাধারন মানুষ সহজ ভাবে ট্যাক্স ব্যাপারটা কী এবং অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মোহিত চাইলেই সে রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য কিনা বুঝতে পারে। রাষ্ট্র আপনার কাছ নানান ধরনের খাজনা নিচ্ছে। কেন নিচ্ছে? কারন রাষ্ট্রের খর্চাখরচ আছে। যেমন, পুলিশ-র্যা ব-সেনাবাহিনী-আমলাদের বেতন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের বেতন, রাস্তাঘাট তৈরিতে খরচ, বড় বড় প্রকল্পের জন্য খরচ, ইত্যাদি । তো ঠিক আছে। এটা তো মোগল আমলে রাজরাজড়াও নিতো, তাই না? ইংরেজ আমলে নিতো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। তারপর নিতেন বিলাতের রাণি। বিলাতের রাণি ঔপনিবেশিক শাসন বলবৎ রাখার জন্য। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ নেটিভদের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অর্থের জোগানের জন্য খাজনা বা ট্যাক্স। আপনার আয় দিয়ে আপনাকে ঔপনিবেশিক শৃংখলে বেঁধে রাখা হোত, বিলাতি শাসন চালানোর অর্থ জোগান হোত। কী সুন্দর ব্যবস্থা! কিন্তু এখন? মোঘলাই কিম্বা ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কি?

আপনার ট্যাক্স নিয়ে এক শ্রেণীর বড়লোককে আরো ধনি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনিকি পাকিস্তান বা ঔপনিবেশিক আমলেও এটা হয় নি। লর্ড ক্লাইভের আমলে দেশের সামগ্রিক আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিও এভাবে লুন্ঠন ও শোষণ করে নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যেভাবে অল্প কিছু ব্যাক্তি ও পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার তুলনা ইতিহাসে আছে কিনা সন্দেহ।

বাংলাদেশ কি তাহলে মোঘলদের মনসবদারি? লর্ড ক্লাইভের নতুন কর্পোরেট সামাজ্য? পাকিস্তানের দুই অর্থ নীতির অর্থনৈতিক অসাম্য? আমরা নাকি বাইশ পরিবারের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি? এখন কয় পরিবার আমাদের নির্বিঘ্নে লুটতরাজ করছে? আপনি দেখছেন, নিয়মিত লুট হচ্ছে ব্যাংক। এটা দুই একটি ব্যাংকের দুর্নীতি না। এমন এক ব্যাংক ব্যবস্থাই এই রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠেছে যাতে লুটতরাজ ও ডাকাতি সহজ হয়। এমনকি ব্যাংক আইনও বদলানো হচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেটা এমনই যে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও ডিজিটাল কায়দায় লুট হয়েছে। তাহলে ট্যাক্স নিয়ে প্রাথমিক তর্ক হচ্ছে, ঘটনা কী আসলে?

সেটা বুঝতে হলে বোঝা দরকার পুরানা সামন্ত বা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কি তফাৎ? আমরা দেখতে পারছি রাষ্ট্র স্রেফ ডাকাতদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়, তাহলে তারা ট্যাক্স দাবি করলেই আমর দিচ্ছি কেন? তাদের ট্যাক্স আরোপের বৈধতা কোঠায়? এটাই এখনকার প্রশ্ন। সামন্ত বা মোঘলাই শাসন ব্যবস্থায় রাজা মাত্রই বৈধ, তার অস্রো র জোরই আপনার কাছ থেকে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আদায় করার বৈধতা। আপনাকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে বলে আপনি তাকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতেন। ঔপনিবেশিক আমলও চরিত্রের দিক থেকে এই ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিক বল প্রয়োগের ক্ষমতাই এই ক্ষেত্রে বৈধতা। ইংরেজ অস্ত্র ও বারুদের জোরে আপনার প্রভু হয়েই এসেছে; আপনি পরাজিত, বিজিতের অধীন এবং বাইরের শক্তি দ্বারা শাসিত। অতএব আপনি ইংরেজকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খাজনা। শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধতা তাহলে কি দ্বারা নির্ণয় করা হয়?

‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ব্যক্তির আবির্ভাব

ইউরোপে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই সামনে চলে এসেছিল। ট্যাক্স নেবার বৈধ অধিকারী কে? রাষ্ট্র? কিন্তু কি ধরনের রাষ্ট্র? এই প্রশ্নটা জারি রাখলে আমরা রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের বৈপ্লবিক পর্বটা বুঝব। বুঝব সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নতুন গড়ে ওঠা ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কী ধরণের শ্লোগান তুলছে ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কার্যকর করছে। সেটা বুঝলে আধুনিক গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত তার মর্ম আমরা ধরতে পারব। রাষ্ট্রের ন্যূনতম যে চরিত্র না থাকলে গণতন্ত্রে আপনি রাষ্ট্রকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য না, অন্তত পক্ষে সেটা বুঝবেন। ইংলণ্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবার খুবই গোড়ার জায়গা সেটা। অর্থাৎ বুঝতে হবে পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ কোন্‌ অধিকারে জনগণের ওপর ট্যাক্স আরোপ, আদায় ও খরচ করতে পারে? আধুনিক রাষ্ট্র তো রাজতন্ত্র নয়, যে রাজার দৈবশক্তির বলেই রাজা ট্যাক্স বসাতে পারেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ তো আল্লার তরফে নাজিল হওয়া ফেরেশতাদের সভা নয়। আধুনিক রাষ্ট্র তাহলে কোন্‌ অধিকারে ট্যাক্স দাবি করে? কোথা থেকে জাতীয় সংসদ এই শক্তি পায়? এই শক্তির বৈধতা কি? এটা বোঝা বাংলাদেশে আমাদের জন্য খুবই জরুরী। এগুলো অতিশয় গোড়ার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্রের বর্ণপরিচয় শিক্ষার অ তে অজগর স্তরের ব্যাপার। এটা বুঝতে পারলে আধুনিক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাও আমরা বুঝব।

বামপন্থিদের লেখালিখিতে বাংলাভাষায় ‘বুর্জোয়া’ ধনিদের গালি দেবার ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সমাজ ও রাজনীতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হিসাবে নয়। সে কারণে বামপন্থিরা ‘ধনিক শ্রেণি’ আর ‘বুর্জোয়া’ পালাটা পালটি করে ব্যবহার করতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। বোঝার উপায় নাই ধনি মানেই বুর্জোয়া আর বুর্জোয়া মানেই ধনি কিনা। ধনি কথাটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝায়। সে বুর্জোয়া চেতনার ধারক নাকি ধারক নয় সেটা ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দ্বারা বোঝা যায়, তার অর্থনৈতিক অবস্থান দ্বারা না। তবে ধরে নেওয়া হয় যে ধনি পরিবারের সন্তান ধনি শ্রেণির চেতনাই সাধারণত ধারণ করে। কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নাই, শ্রমিকেরা শ্রমিক বলেই শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শ ধারণ করে এই প্রকার রোমান্টিক ধারণা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি শুরু করার শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। বুর্জোয়া সমাজে শ্রমিকের চেতনা বুর্জোয়া চিন্তাচেতনা দ্বারাই প্রভাবিত থেকে; তাদের ওপর রাজনৈতিক আন্দোলন ছেড়ে দিলে তারা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়ন অবধি যেতে পারে, আর পারে না, এটা বুঝেই লেনিন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা কাজের ওপর নির্ভর করেন নি। তিনি চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিতে কৌশলে ইতিহাস সচেতন অগ্রসর রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে তার নানান কারন আছে। কিন্তু বলশেভিক বিপ্লব একটি সফল রাজনৈতিক বিপ্লব। যার মধ্য দিয়ে ‘জারতন্ত্রের পতন ঘটেছি। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান এটা মানে যে প্রাক বুর্জোয়া সমাজে যারা নিদেন পক্ষে বুর্জোয়া চেতনা বিরোধী ক্ষমতাসীনদের বৈপ্লবিক কায়দায় উৎখাত করে নিজেদের শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে চায় তারা লেনিনের বৈপ্লবিক নীতি ও কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ না করে সফল হতে পারবে না। বিশেষত সমাজের তর্ক বিতর্কে কিভাবে বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা ব্যাক্ত হচ্ছে, কিভাবে তাকে আমলে নিতে হয় এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় আশু কর্তব্য কিভাবে স্পষ্ট ভাবে নির্ধারন করতে হয়, কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর নিজেদের চিন্তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রচার চালাতে হয় — ইত্যাদি শিক্ষা লেনিন ছাড়া এখনও দেবার মতো ঐতিহাসিক কোন ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটে নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যার্থ বটে, কিন্তু লেনিনের কাছ থেকে শিক্ষা না নিয়ে বৈপ্লবিক রাজনীতি একালেও অসম্ভব প্রকল্প।

বলশেভিক লেনিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে বুর্জোয়া চেতনাকে যথাযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেন নি; ব্যক্তির চেতনাগত বিকাশ ছাড়া ওপর থেকে ডিক্রি জারি করে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্র দিয়ে গায়ের জোরে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করবার চেষ্টা করেছিলেন। ‘বুর্জোয়া চেতনা’ – বিশেষত নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তি ভাবা, এবং ব্যক্তি হিসাবে সমষ্টির চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আমার নিজের ব্যক্তি অধিকারকে আর সব কিছুর ওপর স্থান দেওয়া ইতিহাসের বিশেষ একটা পর্ব। যা হাওয়াই কায়দায়, কিম্বা বল প্রয়োগ করে অতিক্রম করা যায় না। চেতনাগত বিকাশের লড়াই কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই। শুধু উৎপাদন ব্যবাস্তা বা উৎপাদন সম্পর্ক বদলিয়ে কিম্বা শুধু অন্ন বাস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করলে সে লড়াইয়ে জেতা যায় না। বহু ব্যার্থতার পর ইতিহাস থেকে মানুষএই শিক্ষা টুকু নিতে চাইছে যে মানুষ স্রেফ জীবমাত্র নয়, তার ব্যাক্তি ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে কিভাবে সমষ্টির অভিপ্রায়ে রূপান্তর করা যায় সেটা ইতিহাসের বাস্তব সমস্যা হিসাবে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাজির হয়েছে। বিপ্লবের পুরানা চিন্তা দিয়ে আর কাজ হবে না।

যে কেউই ধনি কিম্বা গরিব হতেই পারে, কিন্তু বুর্জোয়া হওয়া না হওয়া তার নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনাগত ব্যাপার। সামন্ত ব্যবস্থা ও সামন্ত সংস্কৃতির বিপরীতে ব্যক্তির স্বাধীন কর্তাসত্তা ও অধিকারবোধ ইতিহাসে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে সেটা আমরা ইউরোপে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর ইতিহাস বা সরল ভাষায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করলে দেখি। সেখানে জন্মসূত্রে সমাজে অভিজাতদের শাসন মেনে নেবার বিরুদ্ধে বুর্জোয়া তার নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তি অধিকারের জন্য লড়ে। দাবি তোলে — কার জন্ম কিভাবে হোল, কে অভিজাত কে নিম্ন বর্গ, কে ধনি কে গরিব সেটা বিবেচনার বিষয় না। মানুষ মাত্রই এক, তাই তারা সমান। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যক্তির ঐতিহাসিক আবির্ভাবকে নিশ্চিত করে।

বুর্জোয়া মতবাদ তাই ব্যক্তিতান্ত্রিক, কিন্তু সাম্যবাদী মতবাদ। ব্যাক্তি হিসাবে আমি আর তুমি এক, আমরা সমান, তাই জন্মের আভিজাত্য কিম্বা অর্থনৈতিক অবস্থা দ্বারা আমরা কে ছোট কে বড় ঠিক হবে না; বরং রাজনৈতিক পরিসর ও রাষ্ট্রে ছখে আমরা এক এবং আমাদের অধিকারও সমান। সম্পত্তিতে ব্যক্তি অধিকার বা ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বুর্জোয়া সমাজ রক্ষা করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যেই ব্যাক্তি তার নিজের ব্যক্তিত্বের চরিতার্থতা নিশ্চিত করতে চায়। এই মায়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন ব্যাপার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কেউ ধনি কিম্বা গরিব হতে পা্রে, কিম্বা অভিজাত কিম্বা নিম্নবর্গ, কিম্বা, বাংলাদেশের কথা ভেবে বলা যায় হতে পারে হিন্দু-মুসললমান-আস্তিক-নাস্তিক, ইত্যাদি — কিন্তু সমাজে সকলের জন্য সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে –যেমন, রাষ্ট্র গঠন, শাসন ব্যবস্থা নির্ণয়, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা সকল ক্ষেত্রেই — আমাদের সকলেরই একই অধিকার। ব্যক্তিই এখানে সার্বভৌম কোন রাজা, কিম্বা অভিজাত নন। এমনকি সমাজও নয়। সমাজ চাইলেই ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবির্ভাবের এটাই রাজনৈতিক চেতনাগত ভিত্তি। একেই আধুনিক কালে নাগরিক ও মানবিক অধিকার বলে থাকে। ব্যক্তির এই ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। তাহলে ভাবা দরকার, আমাদের সমাজে ব্যক্তির এই অধিকার বোধ বা রাজনৈতিক সচেতনতার আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা আবির্ভাব ঘটলেও তাকে আমরা কতোটা লেনিনের মতো আমলে নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করবার কাজে এগিয়ে নিতে পেরেছি। নাকি সমাজতন্ত্রের নামে আমরা উলটা প্রতিক্রিয়াশীল কাজে ব্যস্ত রয়েছি?

বুর্জোয়া বা সাম্যবাদী সমাজ আর কমিউনিজম অবশ্য এক কথা নয়। সমাজ বা সমষ্টির ধারণা ছাড়া ব্যক্তির অধিকার কথাটার কোন অর্থ হয় না। এখানেই কার্ল মার্কসের গুরুত্ব। ব্যক্তি আকাশে বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একা একা বাস করে না। ব্যক্তির অধিকার অতএব সমষ্টির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। সেই সম্বন্ধের চরিত্র উৎপাদন সম্পর্ক যেমন নির্ণয় করে, তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের অভিঘাত থেকে জাত আইনের দ্বারাও নির্দিষ্ট। স্বাধীন ‘ব্যাক্তি’ একটি হাওয়াই ফানুশ, ঘোড়ার ডিমও বলা যায়। ব্যক্তি অতএব পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক দ্বারা হোক কিম্বা হোক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইন উভয়েরই পরাধীনি। সমষ্টি তখন পুঁজি এবং আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত কিম্বা রাষ্ট্রের বিলয় ঘটলেই কমিউনিজম কায়েম হবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। তখন ব্যাকি আর সমাজের সম্বন্ধ কিভাবে নির্ণীত হবে সেটা নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসাবে নতুন পরিস্থিতিতে হাজির হয়ে যাবে। কমিউনিজম গড়তে হোল এমন এক ‘উম্মাহ’ গড়তে হবে যেখানে ব্যক্তি নিজেই তারা সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার দ্বারা উপলব্ধি করে যে সমাজেই তার মুক্তি, সমাজের মধ্যেই তার বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব। তার স্বাধীনতা সমাজের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে হবে, সমাজের বাইরে নয়। কমিউনিজম এই উপলব্ধির সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিণতির অধিক কিছু নয়।

মানুষের সমাজের বাইরে কারুরই একা একা বিকশিত হবার কোন সুযোগ নাই। এই উপলব্ধির রাজনীতি সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের জায়গাগুলো ব্যাক্তির কাছে স্পষ্ট করে তোলে। ব্যক্তি অধিকার হরণ করে যেমন কমিউনিজম গঠন করা যায় না, তেমনি সমাজ, উম্মাহ বা সামষ্টিকতার বিপরীতে ব্যক্তির অধিকারকে সার্বভৌম গণ্য করলে সমাজ টেঁকে না। আমরা দেখেছি, ডিক্রি জারি করে সমাজতন্ত্র গড়বার পরীক্ষা ইতিহাসে ব্যার্থ হয়েছে, কিন্তু তাই বলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই থেমে নাই। কারণ এটাই মানবেতিহাসের শেষ গন্তব্য নয়। ব্যক্তির ‘আধ্যাত্মিক’ অর্থাৎ মানুষের চিত্তবৃত্তি, চিন্তাচেতনা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব নিরসন করে ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণতন্ত্রে ধনিগরিব ছোটবড় নির্বিশেষে সকলের একটাই ভোট, এটাও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায় ইতিহাস তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজার বিরুদ্ধে ব্যক্তির আবির্ভাব কিভাবে ঘটছিল, কিভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছিল এবং কিভাবে ব্যক্তি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আদায় করে নিয়েছিলো সেইসব বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে সেটা আমরা কিভাবে বুঝব? কিম্বা সেই সচেতনতার মাত্রা বা চরিত্র নির্ণয়ের উপায় কি? সেটা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চিন্তা সমাজে উঠছে কিনা, উঠলে কিভাবে উঠছে এবং তার মীমাংসা সমাজ কিভাবে করতে চাইছে ইত্যাদির বিচার। সম্বন্ধ নির্ণয়ের তর্ক বিতর্ক ও মীমাংসার প্রস্তাবনা দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণি ও গোষ্ঠি এবং নারীকুল ও পুরুষকুলকেও আমরা শনাক্ত করতে পারি।

ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল কিনা কিম্বা ঘটলে তার চরিত্র কেমন সেটা খানিক বুঝব রাষ্ট্র যখন আমাদের ওপর খাজনা বা ট্যাক্স আরোপ করে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা। দেখা যায় প্রতিক্রিয়া হয় এত্তো ট্যাক্স এবার? করের বোঝা কত বাড়ল সেটাই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর এক পক্ষ সরকারের সমালোচনা, আরেকপক্ষ সরকারের পক্ষে সাফাই গায়, ইত্যাদি। ট্যাক্স কম না বেশি সেই তর্ক ‘রাজনৈতিক’ নয় – অর্থাৎ এর দ্বারা সমাজে ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা ঘটলেও তার বিকাশের মাত্রা কেমন তার কিছুই আমরা বুঝব না।

কিন্তু ব্যাক্তির বিকাশ কতোটুকু ঘটেছে সেটা একটি মাত্র প্রশ্ন তোলার হিম্মত দেখে বেশ ভাল ভাবেই বোঝা যায়। সেটা হোল যারা করারোপ করছে তারা খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধ কর্তা কিনা? কিভাবে তারা তাদের বৈধতা নিশ্চিত করেছে? আমরা মোঘলাই শাসন, লর্ড ক্লাইভের অধীনস্থ দেওয়ানি কিম্বা ইংরেজের দ্বারা শাসিত প্রজা নই। আমরা যদি স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে থাকি তাহলে এই ক্ষেত্রে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কে যে আমার ওপর খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করছ? তোমার বৈধতা কি?

তুমি নির্বাচিত না তোমারে ট্যাক্স দেবো না

ইংলণ্ডে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে যখন বুর্জোয়া শ্রেণি গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল তখন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান উঠেছিল, সেটা হোল ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’; যদি আমরা তোমাকে নির্বাচিত না করে থাকি তাহলে আমাদের কাছ থেকে খাজনা বা ট্যাক্স নেবার কোন অধিকার কিম্বা বৈধতা তোমার নাই। তুমি নির্বাচিত না হলে তোমাকে খাজনা বা ট্যাক্স দেবো না। বাংলাদেশে কিন্তু আমরা এই বাস্তবতার মধ্যেই এখন নিপতিত হয়েছি। যারা সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে আসেন নি জনগণের ওপর ট্যাক্স বা খাজনা আরোপ করবার কোন অধিকার বা বৈধতা তাদের নাই। এটা গণতন্ত্রের একদমই গোড়ার কথা: নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেসেন্টেশান। আমরা যদি তোমাদের নির্বাচিত না করে থাকি আমরা তোমাদের ট্যাক্স দিতে বাধ্য নই।

তিনটি স্তরে এর মানে আছে। এক হচ্ছে বৈধতার প্রশ্ন, বর্তমান জাতীয় সংসদকে যদি জনগণ নির্বাচিত না করে থাকে তাহলে ক্ষমতাসীনদের আরোপ করা ট্যাক্স জনগণ দিতে বাধ্য না। আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের ট্যাক্স আরোপ করারা বৈধতার এটাই ভিত্তি। দ্বিতীয় মানে হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কিভাবে খরচ হয়েছে তার জবাদিহিতা নিশ্চিত করবার উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থাকা চাই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু নাই, অর্থাৎ জাতীয় সংসদে জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা নাই। রাষ্ট্রের আর কোন প্রতিষ্ঠান নাই যার দ্বারা ডাকাতি ও লুন্ঠনের অর্থের জন্য ক্ষমতাসীনদের আমরা জবাবদিহি করতে পারি। তৃতীয় মানে হচ্ছে ট্যাক্স আরোপ করে রাজস্ব খাতে জমা হওয়া টাকা কিভাবে খরচ করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জনগণের অংশ গ্রহণের অধিকার। সেটাও অনুপস্থিত। অতএব ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোর ডাকাতদের মতো ট্যাক্স নিতে পারে বটে, তবে তা স্রেফ ডাকাতি হবে। এর সঙ্গে গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রের কোন সম্বন্ধ নাই। রাষ্ট্র অল্পকিছু ব্যক্তি বা পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ডাকাতদের হাতে চলে গিয়েছে।

ইংরেজদের ১৬৮৯সালের অধিকারের সনদ (English Bill of Rights 1689) সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোন ট্যাক্স আরোপ করা যাবে না সেই বিধি প্রবর্তন করে। প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবোনা এই দাবি প্রবল ভাবে ওঠে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংলণ্ড থেকে যাওয়া সেটলারদের। তারা বলল বৃটিশ পার্লামেন্টে আমাদের কোন রিপ্রেজেন্টেশান নাই, কোন প্রতিনিধিত্ব নাই। তাহলে একজন ইংলিশম্যানের যে অধিকার (Rights of Englishmen) সেটা আমাদের ক্ষেত্রে লংঘিত হচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাবি করে তাদের ‘ভার্চুয়াল রিপ্রেজেন্টেশান’ আছে, কিন্তু সেটলাররা তা মানে নি। তারা বলল, যদি পার্লামেন্টে আমাদের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকে তাহলে আমরা ব্রিটেনকে কোন ট্যাক্স দেব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বীজ এই প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ট্যাক্স নাই দাবির ওপর গড়ে ওঠে।

তাহলে ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দাবি। ব্যক্তির বিকাশের মাত্রা নির্ণয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হোক কিম্বা হোক জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম – প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবো না – সব সময়ই কোন না কোন ভাবে উত্থাপিত হয়ই। হতে বাধ্য। মনে রাখা দরকার ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘স্বাধীনতার ইশতাহার’ ঘোষণা করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর তিনটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়: বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ, বৈষম্যের নিরসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সেখানে আন্দোলনের ধারা হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হয়। তাহলে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেবার ইতিহাস আমাদের মুক্তযুদ্ধেরই ইতিহাস। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে এই দাবি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের তুঙ্গ মুহূর্তে মাসাচুসেটস থেকে ১৭৬৪ সালে জেমস অটিস জুনিয়র লিখছেন, ম্যাগনা চার্টারের অধিকার বলে নিজের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্তে বা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে পার্লামেন্টে একজন ব্রিটিশ যে ট্যাক্স দিতে কবুল করে, তার বাইরে অন্য কোন ট্যাক্স দেবার দায় থেকে সে মুক্ত। এই অধিকার যদি ম্যাগনা চার্টার অধিকারের অতিরিক্ত না হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই একজন ব্রিটিশের জন্মগত অধিকার, এই অধিকার ব্রিটিশ কমন ল’য়ের অন্তর্গত। আমি পুরা ইংরেজি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি।

When the parliament shall think fit to allow the colonists a representation in the house of commons, the equity of their taxing the colonies, will be as clear as their power is at present of doing it without, if they please…But if it was thought hard that charter privileges should be taken away by act of parliament, is it not much harder to be in part, or in whole, disfranchised of rights, that have been always thought inherent to a British subject, namely, to be free from all taxes, but what he consents to in person, or by his representative? This right, if it could be traced no higher than Magna Charta, is part of the common law, part of a British subjects birthright, and as inherent and perpetual, as the duty of allegiance; both which have been brought to these colonies, and have been hitherto held sacred and inviolable, and I hope and trust ever will. It is humbly conceived, that the British colonists (except only the conquered, if any) are, by Magna Charta, as well entitled to have a voice in their taxes, as the subjects within the realm. Are we not as really deprived of that right, by the parliament assessing us before we are represented in the house of commons, as if the King should do it by his prerogative? Can it be said with any colour of truth or justice, that we are represented in parliament? (In 1764, the Massachusetts politician James Otis, Jr.) ।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, গণতন্ত্রের কথা বলতে মুখে ফেনা তুলি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খুবই গোড়ার ব্যাপার – যার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াত – আমরা এভাবেই উপেক্ষা করি। গণতন্ত্রে আপনি যদি পার্লামেন্টে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না পাঠাতে পারেন, রাষ্ট্র যদি তা নিশ্চিত করতে না পারে, সেই পার্লামেন্টের বাজেট অবৈধ। তার ট্যাক্স বসাবার, আদায় করবার বা খরচ করবার কোন নৈতিক কিম্বা বৈধ অধিকার নাই।

সবার আগে তাহলে এই কথাটাই বোঝা দরকার। তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাতা বলতে পারা ঐতিয়াসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বলতে পারবেন? যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই, অতএব ব্যক্তিগিরি ফলাবেন না। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। আপনি শোষিত হলে গাঁইগুঁই করেন বটে, কিন্তু ব্যক্তি চেতনা ও ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা নাই। আপনি কথায় কথায় ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনও ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য বহুত দূরের ব্যাপার, কমিউনিস্ট হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়ান।

যান ছোলা খান। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

🖌 চট্টগ্রাম-৯ আসন: দুই-দুই বাপ-বেটা আর একা ছালামের মনোনয়ন দৌড় !

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনোয়ন প্রত্যাশীদের দলে যারা আছেন তারা সম্পর্কে বাবা-ছেলে!

এ আসনে মনোনয়ন চান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তার বড় ছেলে দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। অন্যদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও তার ছেলে মুজিবুর রহমানও মনোনয়নের দৌড়ে আছেন। মনোনয়ন চাইবেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামও।

চট্টগ্রাম মহানগরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন মনে করা হয় কোতোয়ালীকে। সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি’র প্রার্থীই এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বেশি। গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এ আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ থাকলেও নুরুল ইসলাম বিএসসির পরিবর্তে মনোনয়ন পেয়েছিলেন মহাজোট থেকে জিয়াউদ্দিন বাবলু। এটা মহিউদ্দিনের পক্ষে পথ নিষ্কণ্টক করার কৌশল বলে মনে করেছিলেন অনেকেই। পরে তাকে মন্ত্রীত্ব প্রদান করেন শেখ হাসিনা।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে নতুন রুপরেখায় নতুন করে মহিউদ্দিন ও নুরুল ইসলাম বিএসসি মনোনোয়ন প্রত্যাশী হবেন বলে জানা গেছে। তবে মহিউদ্দিন চৌধুরী মনোনোয়ন না পেলেও তার ছেলে নওফেল মনোনোয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন। নওফেল দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়ার পর নারায়নগঞ্জের নির্বাচনে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। এ জন্য সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় গিয়ে নওফেলের প্রশংসা করে এসেছেন। নওফেল ২০১৪ সালে ঘোষিত ৭১ সদস্যের নগর কমিটির নির্বাহী সদস্যও।

জানা গেছে, ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে বাবা মহিউদ্দিনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন তিনি। ওই প্রথম রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেখা যায় লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স থেকে স্নাতক করা এই নওফেলকে। ২০১০ সালেই বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতিবিদ হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ঢাকা বারের এই আইনজীবী চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিরও সদস্য। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বিজয় টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

গত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে চট্টগ্রাম সিটির মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ২০১৫ সালের ২০ মার্চ গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাথে উপস্থিত ছিলেন নওফেলও। ওই সভাতেই চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের পক্ষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন চট্টগ্রামের তিন বারের নির্বাচিত মেয়র মহিউদ্দিন। গণভবনের ওই বৈঠকের আগে একান্ত আলাপে মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্বাস্থ্য বিষয়ে ছেলে নওফেলের কাছে জানতে চান দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিনই ‘পরবর্তীতে’ নওফেলকে মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে বয়সের কারনে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে দল থেকে মনোনোযন না দিলেও তাকে মনোনোয়ন দেওয়া হবে বলে আশা করছেন মহিউদ্দিনপুত্র। তিনি বলেন, আমি আশা করি আগামী সংসদ নির্বাচনে আমার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মনোনোয়ন দেয়া হবে। যদি কোন কারণে তিনি বাদও পড়েন আমি আগামী সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম ৯ আসন থেকে নির্বাচন করতে চাই।

তবে মহিউদ্দন চৌধুরী ও বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের বাকযুদ্ধে বিব্রত চট্টগ্রামবাসী। চট্টগ্রামসবাসীও চায় নতুন নেতৃত্ব। দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারন মানুষরাও জানিয়েছেন তাদের নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশার কথা। মোহসেন তালুকদার নামে খাতুনগঞ্জের এক ব্যবসায়ী জানান, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তো অনেক দেখলাম। তার বয়স হয়েছে। তার ছেলে নওফেল নেতৃত্বে আসলে নতুন চিন্তাধারা যোগ হবে। দলের কোন্দল মিটে মহানগর আওয়ামীলীগ একটা ভালো অবস্থানে যাবে।

এদিকে চট্টগ্রাম-৯ জাতীয় সংসদের ২৮ নং আসন। চট্টগ্রাম-৯ আসনটি চট্টগ্রাম শহরের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত।
২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ৭৯ হাজার ৭৭৯ টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। ওয়াকার্স পার্টির মো: আব্দুল হানিফ ভোট পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৯ টি ভোট। বিএনএফের আরিফ মঊনুদ্দিন পেয়েছিলেন ১ হাজার ৭২ টি ভোট। স্বতন্ত্র আলী আহমেদ নাজির পেয়েছিলেন ১ হাজার ৪১ টি ভোট।

কোতোয়ালী ও বাকলিয়া এলাকা নিয়ে এ আসনটি গঠিত হলেও এখন এই আসনটিতে নগরীর গুরুদ্বপূর্ণ ৫টি থানার অংশ যুক্ত রয়েছে। এই আসনটি চট্টগ্রাম-৮ থাকলেও পরে নির্বাচন কমিশন আসন পুনর্বিন্যাসকালে এটিকে চট্টগ্রাম-৯ করে । ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন হতে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম বিএসসি।

প্রবাদ আছে, এ আসনে যে দল থেকে এমপি নির্বাচিত হন সে দল সরকার গঠন করে এবং এ আসনের এমপি মন্ত্রীত্ব পান। এর প্রমাণও মিলেছে। এ আসনের এমপি ছিলেন বিএনপি’র আবদুল্লাহ আল নোমান, অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দিন, আওয়ামী লীগের প্রয়াত এম এ মান্নান। তারা মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

গত নির্বাচনে বিএনপি না আসায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের নির্বাচনী হিসেব-নিকেষ পাল্টে যাওয়ার কথা ছিলো। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ের বিষয়টি অনেকটা সহজ হয়ে উঠার পথে বাধ সেজেছিলেন বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) মহাসচিব অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দিন এবং জাতীয় পার্টির সোলায়মান আলম শেঠ।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনের মনোনয়ন নিয়েই মূলত মহানগর আওয়ামী লীগে বিরোধের সূত্রপাত। পরে বহু চড়াই উৎড়াই শেষে কেন্দ্র থেকে নুরুল ইসলাম বিএসসিকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নুরুল ইসলাম বিএসসির কাছে প্রায় ৩১ হাজার ৮শ ভোটে হেরে যান বিএনপির অন্যতম হেভিওয়েট প্রার্থী  নগর বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মো. শামসুল আলম। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়ায় নুরুল ইসলাম বিএসসিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।

এদিকে নুরুল ইসলাম বিএসসি বাকলিয়া ও কোতোয়ালী এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি, এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও তিনি ও তার ছেলের কিছু কর্মকান্ডে ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। বাপছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ভূমিদখলের।

২০১২ সালে বেসরকারি আবাসন প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রাম মহাজোটের সাংসদ সাংসদ ও জাসদ নেতা মইনউদ্দিন খান বাদল এবং নুরুল ইসলাম বিএসসির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি ১৪ দলের সভা পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
নগরীর চান্দগাঁও থানার অনন্যা আবাসিক এলাকার পাশে ‘সানোয়ারা সিটি’ নামের একটি আবাসিক প্রকল্প নিয়ে দুই সাংসদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। এ নিয়ে বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য, মানববন্ধন, সভা, সমাবেশসহ পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে একটি অন্যতম আলোচনা-সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

‘সানোয়ারা সিটি’ নামের আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছিলো বিএসসির বড় ছেলে মুজিবুর রহমান। আবাসিক প্রকল্পটির অবস্থান চট্টগ্রাম-৭ আসনের সীমানায়। ওই এলাকার সাংসদ ছিলেন জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা মইনউদ্দীন খান বাদল।

সাংসদ বাদলের অভিযোগ ছিলো, তার নির্বাচনী এলাকার সাদাইয়া বিলের বিভিন্ন কৃষিজমি ও মানুষের জায়গা ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক দখল করে সাংসদ নূরুল ইসলাম বিএসসি’র বড় ছেলে আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছেন। এ নিয়ে চান্দগাঁও এলাকায় স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিবাদ সভা, সমাবেশ সহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে স্থানীয় সাংসদ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মইনউদ্দিন খান বাদল।

আবার গতবছর দেশের সবচেয়ে বড় পোল্ট্রি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মস লিমিটেডের চট্টগ্রামের দোহাজারীতে অবস্থিত একটি বৃহৎ খামারের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র ছেলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, মন্ত্রীর ছেলে মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তার ক্যাডাররা চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীতে অবস্থিত ওই পোল্ট্রি খামারের জায়গা  দখলের চেষ্টা চালায়। এ সময় তারা দোহাজারী কাজী পোল্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর (অব.) শেখ মাসুমুল হাসানসহ সাত কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমান বলেন, আমিও আমার বাবার নামে যে অভিযোগুলো তোলা হয়েছে তা রাজনৈতিক কূটকৌশল। আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করেছে এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। কিন্তু এসব মনোনোয়নে কোনো প্রভাব পড়বে না। চট্টগ্রাম ৯ আসন থেকে আমার বাবাকে মনোনোয়ন দেয়া হলে আমি চট্টগ্রাম ৮ আসন থেকে মনোনোয়ন চাইব। আর আমার বাবাকে মনোনোয়ন না দেয়া হলে চট্টগ্রাম ৯ আসন থেকে আমিই চাইব মনোনোয়ন।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম ৯ আসন থেকে মনোনোয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। কেন মনোােয়ন চাইবেন এ প্রশ্নের উত্তরে আবদুচ ছালাম জানান, তিনি সংসদ নির্বাচন করতে চান।  অতীতে দুবার মনোনোয়ন চেয়ে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। রাজনীতি কর্মীদের একটা স্বপ্ন থাকে। সিডিএ একটা স্বল্প পরিধি। এ পরিধি থেকে বৃহৎ পরিসরে কাজ করার সুযোগ মিলবে সাংসদ মন্ত্রী হলে। আর এ উর্দ্ধমুখী প্রত্যাশার জন্যই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চট্টগ্রাম ৯ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য মনোনোয়ন চাইবেন।

তিনি নগরীর তার কাজে উপকৃত হয়েছে বলে জানান, চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ শহর। আর এ বন্দরকে মাথায় রেখে চট্টগ্রামের উন্নয়স করেছি আমি। কারন বন্দর সুবিধায় থাকলে সব সুবিধায় থাকবে।

তিনি বলেন, ৮ বছরে ৯ আসনে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার কাজ করেছি। আর যে বাকলিয়ার ১ লাখ ভোটার জয়পরাজয়ের প্রধান ফ্রক্টর সেই বাকলিয়ার জন্য চাক্তাই খালের মুখ থেকে পাম্প বসানো হয়েছে। যা ছিলো এ এলাকার ৫০ বছরের দাবি ছিলো। আর কোতোয়ালীর ২ লাখ ভোটারের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছেন। কিছু চলমানও রয়েছে। কিন্তু ফ্লাইওভার নির্মানের সুবিধা না মেলায় নগরবাসী ও অনান্য সাংসদ ও মন্ত্রীর তোপের মুখে পড়া নিয়ে তিনি বলেন, আমি কারো চিরবন্ধু না, চির শত্রু না।

ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়া নিয়ে বলেন, কোনো কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ না হলে তার কার্যকারিতা শতভাগ আসে না। ফ্লাইওভার শেষ হোক, তারপর বোঝা যাবে এর সুফল চট্টগ্রামবাসী পাচ্ছে কিনা। প্রসঙ্গত আবদুচ ছালাম ২০০৯ সালের ২৮ মে সিডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে দাযিত্ব গ্রহন করেন। পরবর্তীতে চলতি মাসে ষষ্ঠবারের মতো পুনঃদায়িত্ব পান তিনি।

🖌 ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ – ফরহাদ মজহার

তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাটা বিলাতে রাজার বিরুদ্ধে ইংলিশম্যানরা বলেছে সেই কবে সতেরো শতাব্দিতে। বিলাতের শাসন থেকে মার্কিন রাজ্যগুলো যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করল তখন নির্ধারক রণধ্বণি ছিল এই কথাই ‘নো ট্যাক্সেশান উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’। পার্লামেন্টে যদি আমার অথবা আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকে তাহলে সেই পার্লামেন্টে পেশ করা ট্যাক্স আমরা দেবো না। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এইসব অতি গোড়ার কথা। অ তে অজগর জাতীয় বর্ণমালা পরিচয়ের মতো। বিলাত থেকে যদি সংদীয় গণতন্ত্র আমাদানি করেন তো খোলসটা আনলেন কেন? মর্মটা কোথায় ফালাইয়া আসলেন?

কিন্তু আপনি যে এতো গণতন্ত্র, সংসদীয় পদ্ধতি ইত্যাদি বলে মুখে ফেনা তোলেন, আপনি কি এটা জানেন বা জানতেন? প্রতিনিধিত্ব না থাকলে পার্লামেন্টের ট্যাক্স আরোপের কোন বৈধতা নাই। আপনি দিতে বাধ্য নন। ঐতিহাসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে গণতন্ত্রের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। নইলে গণতন্ত্রের কথা বলবেন না। ডাকাতরা তখন রাষ্ট্র, পার্লামেন্ট ইত্যাদি হাইকোর্ট দেখিয়ে তাদের লুটতরাজ ও ডাকাতি অব্যাহত রাখবে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। হুঁশে আসুন।

এখন আপনি আবুল আল আবদুল মোহিত সাহেবকে কি বলতে পারবেন যে আপনারে ট্যাক্স দিমু না কারণ আপনারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না। যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই। কেন নাই? আপনি ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। অথচ কথায় কথায় ব্যক্তিগিরি ফলান। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। শোষিত হলে পোষা কুকুর ছানার মতো মনিবের কোলে গাঁইগুঁই করেন কিন্তু ব্যাক্তি চেতনা ও আপনার ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নাই । ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য এখনও বহুত দূরের ব্যাপার, অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়িয়ে যাচ্ছেন। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তো দূরের কথা, শহুরে মধ্যবিত্ত সুলভ বুর্জোয়া চেতনার অধিকারও হতে পারেন নি,

অথচ চেতনাবাজি করে বেড়াচ্ছেন!

যান ছোলা খান গিয়া। বাজেট নিয়া কথা বলতে গিয়ে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না
বাজেটের পরিসংখ্যান নিয়ে তর্কাতর্কি পরে করুন। গণিত পরে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেবেন না। সহজ করে ভাবুন, যাতে সাধারন মানুষ সহজ ভাবে ট্যাক্স ব্যাপারটা কী এবং অর্থমন্ত্রী আবুল আল আব্দুল মোহিত চাইলেই সে রাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য কিনা বুঝতে পারে। রাষ্ট্র আপনার কাছ নানান ধরনের খাজনা নিচ্ছে। কেন নিচ্ছে? কারন রাষ্ট্রের খর্চাখরচ আছে। যেমন, পুলিশ-র্যা ব-সেনাবাহিনী-আমলাদের বেতন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের বেতন, রাস্তাঘাট তৈরিতে খরচ, বড় বড় প্রকল্পের জন্য খরচ, ইত্যাদি । তো ঠিক আছে। এটা তো মোগল আমলে রাজরাজড়াও নিতো, তাই না? ইংরেজ আমলে নিতো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। তারপর নিতেন বিলাতের রাণি। বিলাতের রাণি ঔপনিবেশিক শাসন বলবৎ রাখার জন্য। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ নেটিভদের কাছ থেকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অর্থের জোগানের জন্য খাজনা বা ট্যাক্স। আপনার আয় দিয়ে আপনাকে ঔপনিবেশিক শৃংখলে বেঁধে রাখা হোত, বিলাতি শাসন চালানোর অর্থ জোগান হোত। কী সুন্দর ব্যবস্থা! কিন্তু এখন? মোঘলাই কিম্বা ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য কি?

আপনার ট্যাক্স নিয়ে এক শ্রেণীর বড়লোককে আরো ধনি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনিকি পাকিস্তান বা ঔপনিবেশিক আমলেও এটা হয় নি। লর্ড ক্লাইভের আমলে দেশের সামগ্রিক আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিও এভাবে লুন্ঠন ও শোষণ করে নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যেভাবে অল্প কিছু ব্যাক্তি ও পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার তুলনা ইতিহাসে আছে কিনা সন্দেহ।

বাংলাদেশ কি তাহলে মোঘলদের মনসবদারি? লর্ড ক্লাইভের নতুন কর্পোরেট সামাজ্য? পাকিস্তানের দুই অর্থ নীতির অর্থনৈতিক অসাম্য? আমরা নাকি বাইশ পরিবারের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি? এখন কয় পরিবার আমাদের নির্বিঘ্নে লুটতরাজ করছে? আপনি দেখছেন, নিয়মিত লুট হচ্ছে ব্যাংক। এটা দুই একটি ব্যাংকের দুর্নীতি না। এমন এক ব্যাংক ব্যবস্থাই এই রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে উঠেছে যাতে লুটতরাজ ও ডাকাতি সহজ হয়। এমনকি ব্যাংক আইনও বদলানো হচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেটা এমনই যে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকও ডিজিটাল কায়দায় লুট হয়েছে। তাহলে ট্যাক্স নিয়ে প্রাথমিক তর্ক হচ্ছে, ঘটনা কী আসলে?

সেটা বুঝতে হলে বোঝা দরকার পুরানা সামন্ত বা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কি তফাৎ? আমরা দেখতে পারছি রাষ্ট্র স্রেফ ডাকাতদের প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়, তাহলে তারা ট্যাক্স দাবি করলেই আমর দিচ্ছি কেন? তাদের ট্যাক্স আরোপের বৈধতা কোঠায়? এটাই এখনকার প্রশ্ন। সামন্ত বা মোঘলাই শাসন ব্যবস্থায় রাজা মাত্রই বৈধ, তার অস্রো র জোরই আপনার কাছ থেকে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আদায় করার বৈধতা। আপনাকে বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে বলে আপনি তাকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতেন। ঔপনিবেশিক আমলও চরিত্রের দিক থেকে এই ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিক বল প্রয়োগের ক্ষমতাই এই ক্ষেত্রে বৈধতা। ইংরেজ অস্ত্র ও বারুদের জোরে আপনার প্রভু হয়েই এসেছে; আপনি পরাজিত, বিজিতের অধীন এবং বাইরের শক্তি দ্বারা শাসিত। অতএব আপনি ইংরেজকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য। প্রশ্ন হচ্ছে তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খাজনা। শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধতা তাহলে কি দ্বারা নির্ণয় করা হয়?

‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ব্যক্তির আবির্ভাব

ইউরোপে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই সামনে চলে এসেছিল। ট্যাক্স নেবার বৈধ অধিকারী কে? রাষ্ট্র? কিন্তু কি ধরনের রাষ্ট্র? এই প্রশ্নটা জারি রাখলে আমরা রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের বৈপ্লবিক পর্বটা বুঝব। বুঝব সামন্তবাদের বিরুদ্ধে নতুন গড়ে ওঠা ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কী ধরণের শ্লোগান তুলছে ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কার্যকর করছে। সেটা বুঝলে আধুনিক গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত তার মর্ম আমরা ধরতে পারব। রাষ্ট্রের ন্যূনতম যে চরিত্র না থাকলে গণতন্ত্রে আপনি রাষ্ট্রকে খাজনা বা ট্যাক্স দিতে বাধ্য না, অন্তত পক্ষে সেটা বুঝবেন। ইংলণ্ডে সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবার খুবই গোড়ার জায়গা সেটা। অর্থাৎ বুঝতে হবে পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ কোন্‌ অধিকারে জনগণের ওপর ট্যাক্স আরোপ, আদায় ও খরচ করতে পারে? আধুনিক রাষ্ট্র তো রাজতন্ত্র নয়, যে রাজার দৈবশক্তির বলেই রাজা ট্যাক্স বসাতে পারেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ তো আল্লার তরফে নাজিল হওয়া ফেরেশতাদের সভা নয়। আধুনিক রাষ্ট্র তাহলে কোন্‌ অধিকারে ট্যাক্স দাবি করে? কোথা থেকে জাতীয় সংসদ এই শক্তি পায়? এই শক্তির বৈধতা কি? এটা বোঝা বাংলাদেশে আমাদের জন্য খুবই জরুরী। এগুলো অতিশয় গোড়ার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্রের বর্ণপরিচয় শিক্ষার অ তে অজগর স্তরের ব্যাপার। এটা বুঝতে পারলে আধুনিক গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতাও আমরা বুঝব।

বামপন্থিদের লেখালিখিতে বাংলাভাষায় ‘বুর্জোয়া’ ধনিদের গালি দেবার ভাষা হিসাবে ব্যবহার করা হয়, সমাজ ও রাজনীতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হিসাবে নয়। সে কারণে বামপন্থিরা ‘ধনিক শ্রেণি’ আর ‘বুর্জোয়া’ পালাটা পালটি করে ব্যবহার করতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলে। বোঝার উপায় নাই ধনি মানেই বুর্জোয়া আর বুর্জোয়া মানেই ধনি কিনা। ধনি কথাটা ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝায়। সে বুর্জোয়া চেতনার ধারক নাকি ধারক নয় সেটা ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দ্বারা বোঝা যায়, তার অর্থনৈতিক অবস্থান দ্বারা না। তবে ধরে নেওয়া হয় যে ধনি পরিবারের সন্তান ধনি শ্রেণির চেতনাই সাধারণত ধারণ করে। কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নাই, শ্রমিকেরা শ্রমিক বলেই শ্রমিক শ্রেণির মতাদর্শ ধারণ করে এই প্রকার রোমান্টিক ধারণা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি শুরু করার শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। বুর্জোয়া সমাজে শ্রমিকের চেতনা বুর্জোয়া চিন্তাচেতনা দ্বারাই প্রভাবিত থেকে; তাদের ওপর রাজনৈতিক আন্দোলন ছেড়ে দিলে তারা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়ন অবধি যেতে পারে, আর পারে না, এটা বুঝেই লেনিন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা কাজের ওপর নির্ভর করেন নি। তিনি চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিতে কৌশলে ইতিহাস সচেতন অগ্রসর রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে তার নানান কারন আছে। কিন্তু বলশেভিক বিপ্লব একটি সফল রাজনৈতিক বিপ্লব। যার মধ্য দিয়ে ‘জারতন্ত্রের পতন ঘটেছি। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান এটা মানে যে প্রাক বুর্জোয়া সমাজে যারা নিদেন পক্ষে বুর্জোয়া চেতনা বিরোধী ক্ষমতাসীনদের বৈপ্লবিক কায়দায় উৎখাত করে নিজেদের শাসন ক্ষমতা কায়েম করতে চায় তারা লেনিনের বৈপ্লবিক নীতি ও কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ না করে সফল হতে পারবে না। বিশেষত সমাজের তর্ক বিতর্কে কিভাবে বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা ব্যাক্ত হচ্ছে, কিভাবে তাকে আমলে নিতে হয় এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় আশু কর্তব্য কিভাবে স্পষ্ট ভাবে নির্ধারন করতে হয়, কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর নিজেদের চিন্তার আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রচার চালাতে হয় — ইত্যাদি শিক্ষা লেনিন ছাড়া এখনও দেবার মতো ঐতিহাসিক কোন ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটে নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যার্থ বটে, কিন্তু লেনিনের কাছ থেকে শিক্ষা না নিয়ে বৈপ্লবিক রাজনীতি একালেও অসম্ভব প্রকল্প।

 বলশেভিক লেনিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হচ্ছে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে বুর্জোয়া চেতনাকে যথাযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেন নি; ব্যক্তির চেতনাগত বিকাশ ছাড়া ওপর থেকে ডিক্রি জারি করে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সম্পন্ন আধুনিক রাষ্ট্র দিয়ে গায়ের জোরে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করবার চেষ্টা করেছিলেন। ‘বুর্জোয়া চেতনা’ – বিশেষত নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তি ভাবা, এবং ব্যক্তি হিসাবে সমষ্টির চিন্তা বাদ দিয়ে কেবল আমার নিজের ব্যক্তি অধিকারকে আর সব কিছুর ওপর স্থান দেওয়া ইতিহাসের বিশেষ একটা পর্ব। যা হাওয়াই কায়দায়, কিম্বা বল প্রয়োগ করে অতিক্রম করা যায় না। চেতনাগত বিকাশের লড়াই কঠিন ও দীর্ঘ লড়াই। শুধু উৎপাদন ব্যবাস্তা বা উৎপাদন সম্পর্ক বদলিয়ে কিম্বা শুধু অন্ন বাস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করলে সে লড়াইয়ে জেতা যায় না। বহু ব্যার্থতার পর ইতিহাস থেকে মানুষএই শিক্ষা টুকু নিতে চাইছে যে মানুষ স্রেফ জীবমাত্র নয়, তার ব্যাক্তি ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে কিভাবে সমষ্টির অভিপ্রায়ে রূপান্তর করা যায় সেটা ইতিহাসের বাস্তব সমস্যা হিসাবে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাজির হয়েছে। বিপ্লবের পুরানা চিন্তা দিয়ে আর কাজ হবে না।

যে কেউই ধনি কিম্বা গরিব হতেই পারে, কিন্তু বুর্জোয়া হওয়া না হওয়া তার নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনাগত ব্যাপার। সামন্ত ব্যবস্থা ও সামন্ত সংস্কৃতির বিপরীতে ব্যক্তির স্বাধীন কর্তাসত্তা ও অধিকারবোধ ইতিহাসে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে সেটা আমরা ইউরোপে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর ইতিহাস বা সরল ভাষায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস পাঠ করলে দেখি। সেখানে জন্মসূত্রে সমাজে অভিজাতদের শাসন মেনে নেবার বিরুদ্ধে বুর্জোয়া তার নিজের মর্যাদা ও ব্যক্তি অধিকারের জন্য লড়ে। দাবি তোলে — কার জন্ম কিভাবে হোল, কে অভিজাত কে নিম্ন বর্গ, কে ধনি কে গরিব সেটা বিবেচনার বিষয় না। মানুষ মাত্রই এক, তাই তারা সমান। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যক্তির ঐতিহাসিক আবির্ভাবকে নিশ্চিত করে।

বুর্জোয়া মতবাদ তাই ব্যক্তিতান্ত্রিক, কিন্তু সাম্যবাদী মতবাদ। ব্যাক্তি হিসাবে আমি আর তুমি এক, আমরা সমান, তাই জন্মের আভিজাত্য কিম্বা অর্থনৈতিক অবস্থা দ্বারা আমরা কে ছোট কে বড় ঠিক হবে না; বরং রাজনৈতিক পরিসর ও রাষ্ট্রে ছখে আমরা এক এবং আমাদের অধিকারও সমান। সম্পত্তিতে ব্যক্তি অধিকার বা ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বুর্জোয়া সমাজ রক্ষা করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যেই ব্যাক্তি তার নিজের ব্যক্তিত্বের চরিতার্থতা নিশ্চিত করতে চায়। এই মায়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন ব্যাপার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কেউ ধনি কিম্বা গরিব হতে পা্রে, কিম্বা অভিজাত কিম্বা নিম্নবর্গ, কিম্বা, বাংলাদেশের কথা ভেবে বলা যায় হতে পারে হিন্দু-মুসললমান-আস্তিক-নাস্তিক, ইত্যাদি — কিন্তু সমাজে সকলের জন্য সামষ্টিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে –যেমন, রাষ্ট্র গঠন, শাসন ব্যবস্থা নির্ণয়, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা সকল ক্ষেত্রেই — আমাদের সকলেরই একই অধিকার। ব্যক্তিই এখানে সার্বভৌম কোন রাজা, কিম্বা অভিজাত নন। এমনকি সমাজও নয়। সমাজ চাইলেই ব্যক্তির অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবির্ভাবের এটাই রাজনৈতিক চেতনাগত ভিত্তি। একেই আধুনিক কালে নাগরিক ও মানবিক অধিকার বলে থাকে। ব্যক্তির এই ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা সংক্ষেপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। তাহলে ভাবা দরকার, আমাদের সমাজে ব্যক্তির এই অধিকার বোধ বা রাজনৈতিক সচেতনতার আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা আবির্ভাব ঘটলেও তাকে আমরা কতোটা লেনিনের মতো আমলে নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করবার কাজে এগিয়ে নিতে পেরেছি। নাকি সমাজতন্ত্রের নামে আমরা উলটা প্রতিক্রিয়াশীল কাজে ব্যস্ত রয়েছি?

বুর্জোয়া বা সাম্যবাদী সমাজ আর কমিউনিজম অবশ্য এক কথা নয়। সমাজ বা সমষ্টির ধারণা ছাড়া ব্যক্তির অধিকার কথাটার কোন অর্থ হয় না। এখানেই কার্ল মার্কসের গুরুত্ব। ব্যক্তি আকাশে বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে একা একা বাস করে না। ব্যক্তির অধিকার অতএব সমষ্টির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। সেই সম্বন্ধের চরিত্র উৎপাদন সম্পর্ক যেমন নির্ণয় করে, তেমনি উৎপাদন সম্পর্কের অভিঘাত থেকে জাত আইনের দ্বারাও নির্দিষ্ট। স্বাধীন ‘ব্যাক্তি’ একটি হাওয়াই ফানুশ, ঘোড়ার ডিমও বলা যায়। ব্যক্তি অতএব পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক দ্বারা হোক কিম্বা হোক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আইন উভয়েরই পরাধীনি। সমষ্টি তখন পুঁজি এবং আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত কিম্বা রাষ্ট্রের বিলয় ঘটলেই কমিউনিজম কায়েম হবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। তখন ব্যাকি আর সমাজের সম্বন্ধ কিভাবে নির্ণীত হবে সেটা নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসাবে নতুন পরিস্থিতিতে হাজির হয়ে যাবে। কমিউনিজম গড়তে হোল এমন এক ‘উম্মাহ’ গড়তে হবে যেখানে ব্যক্তি নিজেই তারা সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার দ্বারা উপলব্ধি করে যে সমাজেই তার মুক্তি, সমাজের মধ্যেই তার বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব। তার স্বাধীনতা সমাজের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে হবে, সমাজের বাইরে নয়। কমিউনিজম এই উপলব্ধির সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরিণতির অধিক কিছু নয়।

মানুষের সমাজের বাইরে কারুরই একা একা বিকশিত হবার কোন সুযোগ নাই। এই উপলব্ধির রাজনীতি সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের জায়গাগুলো ব্যাক্তির কাছে স্পষ্ট করে তোলে। ব্যক্তি অধিকার হরণ করে যেমন কমিউনিজম গঠন করা যায় না, তেমনি সমাজ, উম্মাহ বা সামষ্টিকতার বিপরীতে ব্যক্তির অধিকারকে সার্বভৌম গণ্য করলে সমাজ টেঁকে না। আমরা দেখেছি, ডিক্রি জারি করে সমাজতন্ত্র গড়বার পরীক্ষা ইতিহাসে ব্যার্থ হয়েছে, কিন্তু তাই বলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই থেমে নাই। কারণ এটাই মানবেতিহাসের শেষ গন্তব্য নয়। ব্যক্তির ‘আধ্যাত্মিক’ অর্থাৎ মানুষের চিত্তবৃত্তি, চিন্তাচেতনা ও প্রজ্ঞার বিকাশ ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব নিরসন করে ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণতন্ত্রে ধনিগরিব ছোটবড় নির্বিশেষে সকলের একটাই ভোট, এটাও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায় ইতিহাস তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজার বিরুদ্ধে ব্যক্তির আবির্ভাব কিভাবে ঘটছিল, কিভাবে সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছিল এবং কিভাবে ব্যক্তি রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আদায় করে নিয়েছিলো সেইসব বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশে রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে সেটা আমরা কিভাবে বুঝব? কিম্বা সেই সচেতনতার মাত্রা বা চরিত্র নির্ণয়ের উপায় কি? সেটা বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্বন্ধ নির্ণয়ের চিন্তা সমাজে উঠছে কিনা, উঠলে কিভাবে উঠছে এবং তার মীমাংসা সমাজ কিভাবে করতে চাইছে ইত্যাদির বিচার। সম্বন্ধ নির্ণয়ের তর্ক বিতর্ক ও মীমাংসার প্রস্তাবনা দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণি ও গোষ্ঠি এবং নারীকুল ও পুরুষকুলকেও আমরা শনাক্ত করতে পারি।

ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল কিনা কিম্বা ঘটলে তার চরিত্র কেমন সেটা খানিক বুঝব রাষ্ট্র যখন আমাদের ওপর খাজনা বা ট্যাক্স আরোপ করে তখন আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা। দেখা যায় প্রতিক্রিয়া হয় এত্তো ট্যাক্স এবার? করের বোঝা কত বাড়ল সেটাই আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। এরপর এক পক্ষ সরকারের সমালোচনা, আরেকপক্ষ সরকারের পক্ষে সাফাই গায়, ইত্যাদি। ট্যাক্স কম না বেশি সেই তর্ক ‘রাজনৈতিক’ নয় – অর্থাৎ এর দ্বারা সমাজে ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে কিনা, কিম্বা ঘটলেও তার বিকাশের মাত্রা কেমন তার কিছুই আমরা বুঝব না।

কিন্তু ব্যাক্তির বিকাশ কতোটুকু ঘটেছে সেটা একটি মাত্র প্রশ্ন তোলার হিম্মত দেখে বেশ ভাল ভাবেই বোঝা যায়। সেটা হোল যারা করারোপ করছে তারা খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করবার বৈধ কর্তা কিনা? কিভাবে তারা তাদের বৈধতা নিশ্চিত করেছে? আমরা মোঘলাই শাসন, লর্ড ক্লাইভের অধীনস্থ দেওয়ানি কিম্বা ইংরেজের দ্বারা শাসিত প্রজা নই। আমরা যদি স্বাধীন ব্যক্তি হয়ে থাকি তাহলে এই ক্ষেত্রে প্রথম, প্রধান ও একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কে যে আমার ওপর খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স আরোপ করছ? তোমার বৈধতা কি?

তুমি নির্বাচিত না তোমারে ট্যাক্স দেবো না

ইংলণ্ডে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে যখন বুর্জোয়া শ্রেণি গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল তখন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান উঠেছিল, সেটা হোল ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’; যদি আমরা তোমাকে নির্বাচিত না করে থাকি তাহলে আমাদের কাছ থেকে খাজনা বা ট্যাক্স নেবার কোন অধিকার কিম্বা বৈধতা তোমার নাই। তুমি নির্বাচিত না হলে তোমাকে খাজনা বা ট্যাক্স দেবো না। বাংলাদেশে কিন্তু আমরা এই বাস্তবতার মধ্যেই এখন নিপতিত হয়েছি। যারা সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে আসেন নি জনগণের ওপর ট্যাক্স বা খাজনা আরোপ করবার কোন অধিকার বা বৈধতা তাদের নাই। এটা গণতন্ত্রের একদমই গোড়ার কথা: নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেসেন্টেশান। আমরা যদি তোমাদের নির্বাচিত না করে থাকি আমরা তোমাদের ট্যাক্স দিতে বাধ্য নই।

তিনটি স্তরে এর মানে আছে। এক হচ্ছে বৈধতার প্রশ্ন, বর্তমান জাতীয় সংসদকে যদি জনগণ নির্বাচিত না করে থাকে তাহলে ক্ষমতাসীনদের আরোপ করা ট্যাক্স জনগণ দিতে বাধ্য না। আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের ট্যাক্স আরোপ করারা বৈধতার এটাই ভিত্তি। দ্বিতীয় মানে হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কিভাবে খরচ হয়েছে তার জবাদিহিতা নিশ্চিত করবার উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান থাকা চাই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বলে কার্যত কিছু নাই, অর্থাৎ জাতীয় সংসদে জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা নাই। রাষ্ট্রের আর কোন প্রতিষ্ঠান নাই যার দ্বারা ডাকাতি ও লুন্ঠনের অর্থের জন্য ক্ষমতাসীনদের আমরা জবাবদিহি করতে পারি। তৃতীয় মানে হচ্ছে ট্যাক্স আরোপ করে রাজস্ব খাতে জমা হওয়া টাকা কিভাবে খরচ করা হবে তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জনগণের অংশ গ্রহণের অধিকার। সেটাও অনুপস্থিত। অতএব ক্ষমতাসীনরা গায়ের জোর ডাকাতদের মতো ট্যাক্স নিতে পারে বটে, তবে তা স্রেফ ডাকাতি হবে। এর সঙ্গে গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রের কোন সম্বন্ধ নাই। রাষ্ট্র অল্পকিছু ব্যক্তি বা পরিবারের লুন্ঠনের হাতিয়ার হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ডাকাতদের হাতে চলে গিয়েছে।

ইংরেজদের ১৬৮৯সালের অধিকারের সনদ (English Bill of Rights 1689) সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোন ট্যাক্স আরোপ করা যাবে না সেই বিধি প্রবর্তন করে। প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবোনা এই দাবি প্রবল ভাবে ওঠে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংলণ্ড থেকে যাওয়া সেটলারদের। তারা বলল বৃটিশ পার্লামেন্টে আমাদের কোন রিপ্রেজেন্টেশান নাই, কোন প্রতিনিধিত্ব নাই। তাহলে একজন ইংলিশম্যানের যে অধিকার (Rights of Englishmen) সেটা আমাদের ক্ষেত্রে লংঘিত হচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাবি করে তাদের ‘ভার্চুয়াল রিপ্রেজেন্টেশান’ আছে, কিন্তু সেটলাররা তা মানে নি। তারা বলল, যদি পার্লামেন্টে আমাদের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকে তাহলে আমরা ব্রিটেনকে কোন ট্যাক্স দেব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বীজ এই প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ট্যাক্স নাই দাবির ওপর গড়ে ওঠে।

তাহলে ‘নো ট্যাক্স উইথাউট রিপ্রেজেন্টেশান’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দাবি। ব্যক্তির বিকাশের মাত্রা নির্ণয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে হোক কিম্বা হোক জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম – প্রতিনিধিত্ব না থাকলে ট্যাক্স দেবো না – সব সময়ই কোন না কোন ভাবে উত্থাপিত হয়ই। হতে বাধ্য। মনে রাখা দরকার ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘স্বাধীনতার ইশতাহার’ ঘোষণা করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর তিনটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়: বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ, বৈষম্যের নিরসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। সেখানে আন্দোলনের ধারা হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হয়। তাহলে খাজনা, শুল্ক বা ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেবার ইতিহাস আমাদের মুক্তযুদ্ধেরই ইতিহাস। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে এই দাবি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের তুঙ্গ মুহূর্তে মাসাচুসেটস থেকে ১৭৬৪ সালে জেমস অটিস জুনিয়র লিখছেন, ম্যাগনা চার্টারের অধিকার বলে নিজের প্রত্যক্ষ সিদ্ধান্তে বা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে পার্লামেন্টে একজন ব্রিটিশ যে ট্যাক্স দিতে কবুল করে, তার বাইরে অন্য কোন ট্যাক্স দেবার দায় থেকে সে মুক্ত। এই অধিকার যদি ম্যাগনা চার্টার অধিকারের অতিরিক্ত না হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই একজন ব্রিটিশের জন্মগত অধিকার, এই অধিকার ব্রিটিশ কমন ল’য়ের অন্তর্গত। আমি পুরা ইংরেজি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি।

When the parliament shall think fit to allow the colonists a representation in the house of commons, the equity of their taxing the colonies, will be as clear as their power is at present of doing it without, if they please…But if it was thought hard that charter privileges should be taken away by act of parliament, is it not much harder to be in part, or in whole, disfranchised of rights, that have been always thought inherent to a British subject, namely, to be free from all taxes, but what he consents to in person, or by his representative? This right, if it could be traced no higher than Magna Charta, is part of the common law, part of a British subjects birthright, and as inherent and perpetual, as the duty of allegiance; both which have been brought to these colonies, and have been hitherto held sacred and inviolable, and I hope and trust ever will. It is humbly conceived, that the British colonists (except only the conquered, if any) are, by Magna Charta, as well entitled to have a voice in their taxes, as the subjects within the realm. Are we not as really deprived of that right, by the parliament assessing us before we are represented in the house of commons, as if the King should do it by his prerogative? Can it be said with any colour of truth or justice, that we are represented in parliament? (In 1764, the Massachusetts politician James Otis, Jr.) ।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, গণতন্ত্রের কথা বলতে মুখে ফেনা তুলি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খুবই গোড়ার ব্যাপার – যার ওপর রাষ্ট্র দাঁড়াত – আমরা এভাবেই উপেক্ষা করি। গণতন্ত্রে আপনি যদি পার্লামেন্টে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি না পাঠাতে পারেন, রাষ্ট্র যদি তা নিশ্চিত করতে না পারে, সেই পার্লামেন্টের বাজেট অবৈধ। তার ট্যাক্স বসাবার, আদায় করবার বা খরচ করবার কোন নৈতিক কিম্বা বৈধ অধিকার নাই।

সবার আগে তাহলে এই কথাটাই বোঝা দরকার। তোমারে ট্যাক্স দিমু না, কারন তুমি নির্বাচিত না — এই কথাতা বলতে পারা ঐতিয়াসিক ও গণচেতনা বিকাশের দিক থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বলতে পারবেন? যদি না পারেন আপনার ‘ব্যক্তিত্ব’ নাই, অতএব ব্যক্তিগিরি ফলাবেন না। আপনি এখনও চিন্তা চেতনায় প্রাচীন। আপনি শোষিত হলে গাঁইগুঁই করেন বটে, কিন্তু ব্যক্তি চেতনা ও ব্যক্তি অধিকার কি সে সম্পর্কে আপনার কোন ধারনা নাই। আপনি কথায় কথায় ব্যাক্তি অধিকারের কথা বলেন বটে, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্বন্ধ নির্ণয়ের প্রশ্নে সামন্তীয় যুগের বশ্যতাবোধ নিয়ে বেঁচে আছেন। এখনও ‘বুর্জোয়া’ হতে পারা আপনার জন্য বহুত দূরের ব্যাপার, কমিউনিস্ট হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ যখন তখন প্রগতিশীলতার বুড়ি আওড়ান।

যান ছোলা খান।  ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়বেন না।

১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২ জুন ২০১৭। শ্যামলী।

🖌 খালেদার কার্যালয়ে তল্লাশির প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশির প্রতিবাদে রোববার রাজধানীতে মহানগর বিএনপিসহ বিক্ষোভ মিছিল করেছে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো।

বিভিন্ন স্থানে মিছিলে পুলিশি বাধার খবর পাওয়া গেছে। বাড্ডায় মিছিলে পুলিশের গুলি চালানোর দাবি করে বিএনপি। এতে মহানগর উত্তর বিএনপির এক নেতা আহত হয়েছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর : ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে একটি মিছিল রাজধানীর কুড়িলে ৩০০ ফুট সড়কে অনুষ্ঠিত হয়। বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের সামনে থেকে শুরু হয়ে পিংক সিটি গিয়ে শেষ হয়।

খিলক্ষেত থানা নেতা মোবারক হোসেন দেওয়ান, আনোয়ার হোসেন, ছাত্রনেতা দিদার মোল্লা, জাকির হোসেন, যুবনেতা জুলহাস, আবু লাইক, মিজানুর রহমানসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

সকালের দিকে বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকা থেকে মিছিল বের করে মহানগর উত্তর বিএনপি। বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান ও যুবদল উত্তরের সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে মিছিলটি শুরু হলেই পুলিশ বাধা দেয়।

বাধা উপেক্ষা করে মিছিল করতে গেলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে মাহফুজুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেয়া হয়। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন কর্মী আহত হন।

উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির একটি মিছিল মো. মোস্তফা কামাল হৃদয়ের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ রোড হাউসবিল্ডিং
রোডে অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর-পূর্ব থানা বিএনপির একটি মিছিল মো. আ. সালাম সরকার ও শাহ আলমের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। খিলক্ষেত থানা বিএনপির একটি মিছিলে সিএম আনোয়ার হোসেন ও রাসেল বাবুসহ নেতারা অংশগ্রহণ করেন।

বিমানবন্দর থানা বিএনপির একটি মিছিল ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তরের সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়।

গুলশান থানার একটি বিক্ষোভ মিছিল আ ক ম আবদুল আলীম নকী ও ফারুক হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শুরু হলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়।

ভাটারা থানা বিএনপি নেতা আতাউর রহমান আতা, মোহাম্মদ আলী, ওয়াহিদ উদ্দিন তরুণ ও সেলিমের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল নয়াবাজার থেকে শুরু হয়ে সাইফ নগর একশ ফিটে গিয়ে শেষ হয়।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ : জুরাইন রেলগেট এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দেন হাজী মো. মীর হোসেন মীরু। আরও অংশ নেন বিএনপি নেতা জুম্মন মিয়া, মো. মোজাম্মেল হোসেন প্রমুখ।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আনম সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে বেলা ১১টায় দয়াগঞ্জ জুরাইন রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল হয়।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দুপুরে ডেমরা আমুলিয়া মডেল টাউনের গেটের সামনে থেকে স্টাফ কোয়ার্টার চৌরাস্তা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়।

মহানগর দক্ষিণ বিএনপির প্রচার সম্পাদক আবদুল হাই পল্লব প্রমুখ মিছিলে অংশ নেন।

শাহবাগ থানা বিএনপির উদ্যোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়। এতে নেতৃত্ব দেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নান।

বঙ্গবাজার সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সামনে থেকে কার্জন হল পর্যন্ত এলাকায় আরেকটি বিক্ষোভ মিছিল করে শাহবাগ থানা বিএনপির নেতাকর্মীরা। থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম স্বপন এতে নেতৃত্ব দেন।

স্বেচ্ছাসেবক দল : গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করে স্বেচ্ছাসেবক দল। রোববার সকালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মিছিল বের করলে পুলিশ হামলা চালায়। এতে ১০-১২ জন আহত হন।

মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, সাদরেজ জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি এসএম জিলানী, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, রফিক হাওলাদার, আক্তারুজ্জামান বাচ্চুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজের নেতৃত্বে সকালে ফার্মগেট এলাকায় একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

ছাত্রদল : কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীতে মিছিল করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। রোববার কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের নেতৃত্বে দুপুরে শাহবাগ এলাকায় মিছিল বের করা হয়। পরে শিশুপার্কের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

মিছিলে অংশ নেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা আলমগীর হাসান সোহান, মনিরা আক্তার রিক্তা, আশরাফুর রহমান বাবু, আতিকুজ্জামান রিপন, আসাদুজ্জামান আসাদ, মিয়া মো. রাসেল, মিজানুর রহমান সোহাগ, আজিজুর রহমান আজিজ, মুসফিকুর রহমান লেলিন, শওকত আরা ঊর্মি, মেহবুব মাসুম শান্ত প্রমুখ।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দীকির নেতৃত্বে শাহবাগে আরও একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়।

ছাত্রদল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জজকোর্টের সামনে থেকে শুরু করে রায়সাহেব বাজার এলাকায় মিছিল করে তারা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক ও সাধারণ সম্পাদক আসিফ রহমান বিপ্লবের নেতৃত্বে মিছিলে নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

🖌 অনলাইনে চলছে ‘ভরসা রাখুন নৌকার উপর’ বনাম ‘ভরসা রাখুন আল্লাহ্‌র উপর’ তীব্র তর্কযুদ্ধ | অনলাইনে হঠাৎ কেন নৌকার প্রচার ?!

সম্প্রতি অনলাইনে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো নৌকা নিয়ে বেশ সরব। সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকসহ অনলাইনভিত্তিক নানা ধরনের কার্যক্রমে নৌকা প্রতীকের প্রচার চোখে পড়ার মতো।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১৭ মে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে ‘ভরসা রাখুন নৌকায়’ শিরোনামে একটি অ্যাপলিকেশন চালু করা হয়। এর মাধ্যমে ‘ভরসা রাখুন নৌকায়’ লেখা সংবলিত লোগো দিয়ে ফেসবুকে প্রোফাইল ছবি কাস্টমাইজ করে পরিবর্তন করতে পারছেন ব্যবহারকারীরা। এই অ্যাপলিকেশন চালু হওয়ার পর বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

কিন্তু অনলাইনে হঠাৎ কেন নৌকার প্রচার?

বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেছেন, প্রচারযুদ্ধে অন্যান্য মাধ্যমের পাশাপাশি ফেসবুককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি তাদের পরিকল্পনার অংশ, আকস্মিক কোন বিষয় নয়।

তারা বলছেন, অনলাইন প্রচারণার কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা ও বিশ্বনেতাদের নির্বাচনী জয়ে  অনলাইনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার ফল বিবেচনা করে ডিজিটাল মিডিয়াকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিরোধীপক্ষের অপপ্রচার মোকাবেলার পাশাপাশি সরকারের সাফল্য তুলে ধরতেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে চলতি মাসের শুরুতেই গঠন করা হয় আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি। এতে জায়গা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) এর তিন কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে পরিচিত।

সিআরআই’র একাধিক গবেষক ও বিশ্লেষক বলেছেন, অনলাইনের কনটেন্ট অনেক শক্তিশালী। এই কনটেন্ট একবার সৃষ্টি করা হলে আজীবন থাকবে এমন নিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল কনটেন্ট মানুষের মাঝে দ্রুত ব্যাপক প্রভাব ফেলে। দেশের প্রায় পৌনে তিন কোটি মানুষ এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করছেন।

এই সুযোগকে কাজে লাগাতে অনলাইনের প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালাও হয়। কর্মশালায় অনলাইন প্রচারণায় করণীয় ও কার্যকর কৌশল এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এতে সরকার ও দলের সাফল্য তুলে ধরা, নিজের রাজনৈতিক প্রচার ও প্রসারের জন্য রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এমপিদের লাইনে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

এরপর থেকে মূলত: পাঁচ কারণে প্রচারণা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রখম কারণটি হচ্ছে: গত ৭ মে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সরাসরি নির্দেশ। দ্বিতীয়: গত ৮ মে সংসদ সদস্যদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ, তৃতীয়: সিআরআই’র গবেষণার ফলাফলের নির্দেশনা, চতুর্থ: ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ এবং পঞ্চম: দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা।

‘ভরসা রাখুন নৌকায়’ অ্যাপ্লিকেশনের পাশাপাশি ‘নৌকায় ভোট দিন’ প্রচারও চলছে।

‘নৌকায় ভোট দিন’ পেজের একজন অ্যাডমিন বলেন: আমাদের এই পেজটি মূলত: ছাত্রলীগের সাবেক কর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমে চালিয়ে যাচ্ছেন। তরুণ প্রজন্ম অনলাইনে বেশি সক্রিয় থাকে, আর তরুণ ভোটারই দেশে বেশি। তাই তাদেরকে পর্যাপ্ত তথ্য ও উন্নয়নের চিত্র সম্পর্কে অবহিত করার জন্যই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।