কর্ণফুলীর তলদেশে টানেলের কাজ শুরু আগস্ট মাসে

স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল ও আনোয়ারায় চীনা ইকোনমিক জোন বাস্তবায়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে এ বছরের আগস্ট মাস থেকে। বহুল প্রত্যাশিত এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামে উন্মোচিত হবে শিল্পায়নের নতুন দ্বার। কর্ণফুলী নদীর নিচে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য টানেল প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ে থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্তি হবে।। চীন প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ ছাড় না করায় কর্ণফুলী টানেলের মূল অবকাঠামোর কাজ পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ডিসেম্বরে শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন পায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। নকশা অনুযায়ী, টানেলের শহরপ্রান্ত থাকবে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি পয়েন্টে। অপর প্রান্ত থাকবে নদীর পশ্চিম তীরে আনোয়ারার চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল) এলাকায়। পূর্ব প্রান্তে ৫ কিলোমিটার এবং পশ্চিমে এক কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ চালু হবে। বর্তমানে এই রুটে চলাচলকারী গাড়িগুলো কর্ণফুলী সেতু ও কালুরঘাট সেতু হয়ে চলাচল করে। এতে প্রতি গাড়িকে গড়ে ২০ মিনিট বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। টানেল দিয়ে পার হলে বাড়তি সময় আর লাগবে না। ইতিমধ্যে নেভাল পয়েন্টে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে সেখানে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড বা বেজ ক্যাম্প নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। মোট ৪২ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে যন্ত্রপাতি রাখা, নির্মাণসামগ্রী বানানো এবং শ্রমিক রাখার এই বিশাল শেড। এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে পুরো কর্মযজ্ঞ। টানেল নির্মাণ কাজে বিদ্যুতের চাহিদা সম্পর্কে কবির আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে আজ পর্যন্ত ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। নির্মাণ কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে শিগগিরই ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহে সক্ষম একটি সাব-স্টেশন স্থাপন করা হবে। টানেল এবং কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে টুইন সিটি নির্মাণের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চীনা ইঞ্জিনিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আবাসিক ভবনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা এবং টানেলের জন্য ১ হাজার ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় টানেল নির্মাণের তদারক করবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ। ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের টানেলটির নদীর উভয় পাড়ে এপ্রোচ রোড হবে প্রায় ৬ কিলোমিটার। টানেল প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ে থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। কর্ণফুলী টানেল ও চীনা অর্থনৈতিক জোনকে ঘিরে এখন ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য চট্টগ্রাম নগর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে। এ টানেলটি হতে যাচ্ছে দেশে কোন নদীর তলদেশে প্রথম সুড়ঙ্গ, যা চট্টগ্রামকে চীনের শিল্প নগরী সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউনে পরিণত করবে। নদীর দুই পাশে গড়ে উঠবে শহর। মীরসরাই থেকে শুরু হওয়া মেরিন ড্রাইভ কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারার ওপর দিয়ে কক্সবাজারের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ সড়ক যোগাযোগের ফলে আনোয়ারায় চীনা ইকোনমিক জোন ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামে গড়ে উঠবে অনেক শিল্প কারখানা।

https://www.youtube.com/watch?v=8J-QrkLgP6E

ফয়’স লেক ! চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম পর্যটন স্থান

ফয়’স লেক। পর্যটন নগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র পাহাড়তলীতে অবস্থিত। এই পর্যটন এলাকাটি বলতে গেলে বিশ্বনন্দিত। প্রায় ৩২০ একর জমির উপর এটি স্থাপিত। পাহাড়ে ঘেরা এই লেকটি আগে ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। বর্তমানে এই লেকটিকে কনকর্ড নামক বাংলাদেশের এক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান আরো আধুনিক ও মনোমুগ্ধকরভাবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য এটিকে সাজিয়েছেন এবং এর নামকরণ করা হয়েছে ফয়’স লেক কনকর্ড (এমিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড)।

এই ফয়’স লেকের কোলে ঘেষে রয়েছে ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানা। আর এই চিড়িয়াখানা ফয়’স লেকের সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফয়’স লেকের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ যেকোন পর্যটকের মন কেড়ে নেই নিমেষেই।

FoysLake-3

পাহাড় আর অরুণাময়ী, গোধূলি, আকাশমণি, মন্দাকিনী, দক্ষিণী ও অলকানন্দা নামের হ্রদ। পার্ক পার হয়ে হ্রদের পাড়ে যেতেই দেখা মিলবে সারি সারি বাধা নৌকা। এখান থেকে নৌকায় যেতে মিনিট দশেক লাগবে। তার পরই দেখা মিলবে চমৎকার রিসোর্ট। নৌকায় করে মিনিট দুয়েক যেতেই বাঁক। তারপর দুই দিকে সবুজ পাহাড়। স্বচ্ছ পানির ওপর ছুটে চলা বিভিন্ন রকমের ইঞ্জিনবোটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের গায়ে এসে যেন আছড়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে দু-একটি করে বক এবং নাম না-জানা হরেক রকম পাখি । রয়েছে উন্মুক্তভাবে হরিণ বিচরণের স্থান। সে সময় যদি আকাশ থাকে মেঘলা, কার না ইচ্ছা করবে একটা-দুইটা কবিতার লাইন আওড়াতে? দূরে পরিপাটি কটেজ। হতে পারে রাতযাপন । দোতলা এই কটেজগুলো বাইরে বেশ ছিমছাম, ভেতরটা বিলাসবহুল ও মানসম্মত। আপনার প্রয়োজনের সবকিছুই চাওয়ামাত্র পেয়ে যাবেন। এভাবেই পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি কটেজ। নৌকায় চড়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে পথচলা। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সৌন্দর্য-দুটোকেই অনায়াসে উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাবেন ওয়াটার পার্ক সি ওয়ার্ল্ড কনকর্ডে। পাশেই রয়েছে বিলাসবহুল ভাবে থাকার বন্দোবস্ত। নবদম্পতিদের জন্য রয়েছে হানিমুন কটেজ।

পাহাড়ে ঘেরা আঁকা বাকা মেঠো পথ ধরে যতই সামনের দিকে যায় ততই যেতে ইচ্ছে করে। পিছনে ফিরতে মন চায় না। এই আধুনিক কনকর্ড ফয়’স লেক এ রয়েছে ওয়াটার থিম পার্ক, রিসোর্ট, সি-ওয়ার্ল্ড এবং আরো অনেক আয়োজন। ভ্রমণ প্রেমী যেকেউ একবার এই ফয়’স লেক বেড়াতে আসলে তার বার বার আসতে ইচ্ছে করবেই। পর্যটকরা সাথে করে বাইনাকুলার নিয়ে আসলে পাহাড়ের চূড়া হতে পুরো চট্টগ্রামকে দেখতে পারে এক জায়গায় দাঁড়িয়েই। সাথে তো প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং প্রাকৃতিক লেক আছেই। এই লেকটি আসলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেন ১৯২৪ সালে। আর তৎকালীন রেলওয়ে প্রকৌশলী জনাব ফয় এর নামে নামকরণ করা হয়। সেই থেকে আজ অবধি চট্টগ্রামের এই প্রাণকেন্দ্র ফয়’স লেক সার্বক্ষণিক পর্যটকদের পদচারনায় বিকশিত হচ্ছে দিন দিন। বাংলাদেশী যারা ভ্রমণ পিয়াসু আছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করতে না গিয়ে দেশটাকে দেখুন, দেশের সৌন্দর্য্য অনুধাবন করুন, আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশটিকে বিশ্ব দরবারে পর্যটনের দেশ হিসেবে পরিচিত করুন।

1469825_1401718573404879_1738551112_n1
বিনোদনের জন্য থিম পার্ক ফয়’স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডে আছে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক মানের রাইডস যেমন—সার্কাস ট্রেন, ফ্যামিলি কোস্টার, ফেরিস হুইল, রেডড্রাই স্লাইড, বাম্পার কার, সার্কাস সুইং, স্পিডবোট, ওয়াটার বি। লেকের ওপর ঝুলন্ত সেতু, পাহাড়ের বনাঞ্চলে ট্রাকিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সুউচ্চ টাওয়ার।

অবস্থান
পাহারতলি, নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম
কিভাবে যাবেন সেখানে

ফয়’স লেক, খুজে পাবেন চট্টগ্রাম শহরের মাঝে পাহাড়তলী এলাকায় । নিজস্ব গাড়ী না থাকলে অটো রিক্সা কিংবা সিএনজি করে ৩০ মিনিটেই চলে যেতে পারেন ফয়’স লেকে।
কোথায় থাকবেন

10157151_1415284592074412_3394903736104922978_n1.jpg

রয়েছে ফয়’স লেকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আপনার জন্য আছে বিলাসবহুল থাকার বন্দোবস্ত। পাহাড়ের ধারে লেকের পাড়ে রয়েছে দারুন সব কটেজ ও রিসোর্ট। নবদম্পতিদের জন্য রয়েছে হানিমুন কটেজ। রিসোর্টে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের সুবিধা, যেমন-প্রতিদিনের সকালের নাশতা, থিম পার্ক ফয়’স লেক কনকর্ড অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ড রাইডসগুলো উপভোগ করার সুযোগ এবং দিনভর জলে ভিজে আনন্দ করার জন্য ওয়াটার পার্ক সি ওয়ার্ল্ড কনকর্ড। তা ছাড়া করপোরেট গ্রাহকদের জন্য সভা, বার্ষিক সাধারণ সভা এবং বিভিন্ন রকম ইভেন্টের সুবিধা রয়েছে। অবশ্য ইচ্ছা করলে অন্য আবাসিক হোটেলে থেকেও আপনি ফয়’স লেক ঘুরে দেখতে পারেন।যাঁরা চট্টগ্রামে এসে ফয়’স লেকে থাকতে চান, তাঁদের ঢাকা অফিস থেকে যোগাযোগ করে ফয়’স লেক রিসোর্টে বুকিং দিয়ে আসাই ভালো। ফোন: ০১৯১৩৫৩১৪৮৩, ০১৯১৩৫৩১৪৮০, (০৩১) ২৫৬৬০৮০, ফ্যাক্স: (০৩১) ৬৫৯৪০৬।

135627_10151233696328955_1375296491_o.jpg

প্রবেশমূল্য
খরচটা হাতের নাগালেই। থিম পার্ক ফয়’স লেক কনকর্ড অ্যামাউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডে প্রবেশসহ সব রাইড ২০০ টাকা, ওয়াটার পার্ক সি ওয়ার্ল্ড কনকর্ড প্রবেশসহ সব রাইড ৩৫০ টাকা। ফয়’স লেক রিসোর্টে প্রতিদিন রাত যাপন ২৫০০ থেকে ৭০০০ টাকা এবং রিসোর্ট বাংলোয় প্রতিদিন রাত যাপন ২৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা।

পরিবার নিয়ে অন্যরকম একটি রাত কাটাতে চাইলে উঠতে পারেন রিসোর্ট কিংবা বাংলোতে। ওয়াটার পার্ক সি ওয়ার্ল্ডের লাগোয়া রিসোর্টে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হ্রদমুখী ও পাহাড়মুখী কক্ষ। যেখান থেকে উপভোগ করা যাবে হ্রদ ও পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য। আবার প্রকৃতি ও আধুনিকতার সমন্বয়ে পাহাড়ের কোলে গড়ে তোলা ফয়’স লেকের বাংলোও মনোরম এক স্থান।

রিসোর্ট ও বাংলোয় আগত পর্যটকদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য দিন-রাত চবি্বশ ঘণ্টা খোলা থাকে রেস্টুরেন্ট। এখানে দিনের বেলায় শুনতে পাওয়া যায় পাখির ডাক। আর রাতের সৌন্দর্য সে তো চোখে না দেখলে বোঝানোর নয়। এ সৌন্দর্য পাগল করে তোলে আগতদের।

হাজার বছরের চট্টগ্রামী বাংলা

চট্টগ্রামী বাংলা’র পাঠকদের জন্য আজ থাকল চট্টগ্রামের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভিত্তিক একটি দীর্ঘ পোস্ট।

কী নামে যে ডাকি তোমায় ?

ইতিহাসে চট্টগ্রামের হরেক রকম নাম-

‘চৈত্যগ্রাম’,
‘চতুঃগ্রাম’,
‘চট্টল’,
‘শ্যাৎগাঙ্গ’,
‘চিৎ-তৌৎ-গৌং’,
‘চাটিগ্রাম’,
‘চাটিগাঁ’,
‘চতকাঁও/চাটগাঁও’,
‘সুদকাওয়ান’,
‘চাটিকিয়াং’,
‘শাতজাম’,
‘চার্টিগান’,
‘জেটিগা’

চট্টগ্রামের সুপ্রাচীন ইতিহাসের ধারণা থাকলেও সেরকম কোন নিদর্শন খুজে পাওয়া যায়নি। সীতাকুন্ডের পাহাড়ী এলাকায় প্রস্তরযুগের কিছু অস্ত্রের নমুনা পাওয়া গেছে। প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় ভৌগলিকদের বর্ণনায় চট্টগ্রামের কিছু স্থানের উল্লেখ পাওযা যায়। ইতিহাসবেত্তা ড. নলিনীকান্ত ভট্টাচার্য প্লিনিরপেরিপ্লাসের ক্রিসকে চট্টগ্রামের দ্বীপ সন্দীপ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আবর ল্যাসেনতো পেন্টাপোলিসকেই চট্টগ্রাম মনে করেন।

পালবংশের শাসনামলে আরব পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরকে সমন্দর নামে চিনতো বলে জানা যায়। ধর্মপালের শাসনামলে চট্টগ্রাম তার অধীনে ছিল।

দ্বিতীয় সহস্রাব্দে

দশম ও একাদশ শতকে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গে ও আরাকানে চন্দ্ররাজারা ছিল চট্টগ্রামের শাসক। আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজা সু‌-লা‌-তাইং-সন্দয়া ৯৫৩ সালে বাংলা অভিযানে বের হন। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি চট্টগ্রাম অতিক্রম না করে সীতাকুণ্ডে একটা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। এর শিলালিপিতে লেখা হয় চেৎ‌-ত-গৌঙ্গ যার অর্থ হলো ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’। আরাকানী পুঁথি থেকে জানা যায় এরপর থেকে এই এলাকার নাম হয় চেত্তগৌং। কালক্রমে চেত্তগৌং থেকেচাটিগ্রাম, চাটগাঁ, চট্টগ্রাম, চিটাগাং নামের উৎপত্তি। চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ পূর্ববঙ্গ রাজা শ্রীচন্দ্রের শাসনেই থেকে যায়। একাদশ শতকে দাক্ষিনাত্যের দিগ্বিজয়ভ রাজা রাগন্দ্র চোল এ অঞ্চল দখল করেন।

এর পরের ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। তবে ঔ সময়ে চট্টগ্রামের প্রধান ধর্ম ছিল বৌদ্ধ ধর্ম। তিব্বতীয় পূথি অনুসারে সে সময় চট্টগ্রামে পন্ডিত বিহার নামে একটি বিখ্যাত বিহার ছিল।

মুসলিম শাসনামল

চন্দ্রবংশের পর লালবংশ এবং এরপর কয়েকজন রাজার কথা কিছু ঐতিহাসিক উল্লেখ করলেও ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন তালিশের মতে ১৩৩৮ সালে সুলতান ফকরুদ্দিন মোবারক শাহ‌-এর চট্টগ্রাম বিজয়ের আগ পর্যন্ত ইতিহাস অস্পস্ট। এ বিজয়ের ফলে চট্টগ্রাম স্বাধীন সোনারগাঁও রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

ইবনে বতুতার বিবরণীতে চট্টগ্রাম

সেসময়ে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম আসেন বিখ্যাত মুর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি লিখেছেন –“বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রবেশ করলাম তা হল সোদকাওয়াঙ (চট্টগ্রাম)। এটি মহাসমূদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর, এরই কাছে গঙ্গা নদী- যেখানে হিন্দুরা তীর্থ করেন এবং যমুনা নদী একসঙ্গে মিলেছে এবং সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে তারা সমুদ্রে পড়েছে। গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য জাহাজ ছিল, সেইগুলি দিয়ে তারা লখনৌতির লোকেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। …আমি সোদওয়াঙ ত্যাগ করে কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার দিকে রওনা হলাম।” ১৩৫২‌-৫৩ সালে ফকরুদ্দীন মোবারক শাহ এর পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহকে হত্যা করে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ইলিয়াস শাহ বাংলার মসনদ দখল করলে চট্টগ্রামও তার করতলগত হয়। তার সময়ে চট্টগ্রাম বাংলা প্রধান বন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর হিন্দুরাজা গণেশ ও তার বংশধররা চট্টগ্রাম শাসন করে। এরপরে বাংলায় হাবমী বংশ প্রতিষ্ঠা হয়।

চীনা পর্যটকের বিবরণীতে চট্টগ্রাম

পনের শতকের চট্টগ্রামের একটি বিবরণ পাওয়া যায় চীনা পরিব্রাজক ফেই‌-শিন এর ‘’শিং-ছা-শ্যাং-লান’’ নামের ভ্রমণ গ্রণ্থে। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ-এর আমলে চীনা দূতদের মধ্যে ফেই-শিন ছিলেন। ১৪৩৬ খ্রীস্টাব্দে তিনি উক্ত বইতে চট্টগ্রাম সম্পর্কিত বর্ণনা দেন :
বাতাস অনুকূল থাকলে সুমাত্রা থেকে এই দেশে কুড়ি দিনে পৌঁছানো যায়। এ দেশ (চীনের) পশ্চিমে অবস্থিত ভারতবর্ষ নামে দেশটির অন্তর্গত। সম্রাট যুং-লোর রাজত্বের ত্রয়োদশ বর্ষে (১৪১৫ খ্রি.) সম্রাট দুইবার আদেশ জারি করার পরে প্রতিনিধি হৌ-শিয়েনএক বিরাট নৌবহর আর এবং অনেক লোকজন নিয়ে (বাংলার) রাজা, রানি এবং অমাত্যদের কাছে তাঁর (চীন সম্রাটের) উপহার পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হলেন। এই দেশটির উপসাগরের কূলে একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে তার নাম চা-টি-কিয়াং। এখানে কোন কোন শুল্ক আদায় করা হয়। রাজা যখন শুনলেন আমাদের জাহাজ সেখানে পৌছেছে, তিনি পতাকা ও অন্যান্য উপহার সমেত উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারীদের সেখানে পাঠালেন। হাজারেরও বেশি ঘোড়া ও মানুষ বন্দরে এসেহাজির হল। ষোলটি পর্ব অতিক্রম করে আমরা সুও‌-না-উল-কিয়াং (সোনারগাঁও)-তে পৌঁছলাম। এই জায়গাটি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা; এখানে পুকুর, রাস্তাঘাট ও বাজার আছে, সেখানে সবরকম জিনিসের বেচাকেনা চলে। এখানে রাজার লোকেরা হাতি, ঘোড়া, প্রভৃতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করলো।
কিন্তু ১৪৯২ সালে সুলতান হোসেন শাহ বাংলা সুলতান হোন। কিন্তু চট্টগ্রামের দখল নিয়ে তাকে ১৪১৩-১৪১৭ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরার রাজা ধনমানিক্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজা ধনমানিক্যের মৃত্যুর পর হোসেন শাহ‌-এর রাজত্ব উত্তর আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার সময়ে উত্তর চট্টগ্রামের নায়েব পরাগল খানের পুত্র ছুটি খাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকর নন্দী মহাভারতের একটি পর্বের বঙ্গানুবাদ করেন।

পর্তুগিজদের আগমন ও বন্দরের কতৃত্ব লাভ

১৫১৭ সাল থেকে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে আসতে করে। বাণিজ্যের চেয়ে তাদের মধ্যে জলদস্যুতার বিষয়টি প্রবল ছিল। সুলতান প্রবলভাবে তাদের দমনের চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সময় আফগান শাসক শের শাহ বাংলা আক্রমণ করবে শুনে ভীত সন্ত্রস্ত হোসেন শাহ পর্তুগিজদের সহায়তা কামনা করেন। তখন সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ১৫৩৭ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি নির্মান করে। একই সঙ্গে তাদেরকে বন্দর এলাকার শুল্ক আদায়ের অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৫৩৮ সালে শের শাহ‌-র সেনাপতি চট্টগ্রাম দখল করে। তবে, ১৫৮০ পর্যন্ত আফগান শাসনামলে সবসময় ত্রিপুরা আর আরাকানীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলেছে।

আরাকানী শাসন

১৫৮১ সাল থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে আরাকান রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। তবে, পর্তুগিজ জলদস্যুদের দৌরাত্ম এ সময় খুবই বৃদ্ধি পায়। বাধ্য হয়ে আরাকান রাজা ১৬০৩ ও ১৬০৭ সালে শক্ত হাতে পর্তুগিজদের দমন করেন। ১৬০৭ সালেই ফরাসি পরিব্রাজক ডি লাভাল চট্টগ্রাম সফর করেন।তবে সে সময় পর্তুগিজ জলদস্যু গঞ্জালেস সন্দীপ দখল করে রাখে। পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানরিক ১৬৩০-১৬৩৪ সময়কালে চট্টগ্রামে উপস্থিতকালে চট্টগ্রাম শাসক আলামেনের প্রসংসা করে যান। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মোগলদের হস্তগত হয়।

চট্টগ্রামে আরাকানী শাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম আরাকানীদের কাছ থেকে অনেক কিছুই গ্রহণ করে। জমির পরিমাণে মঘী কানির ব্যবহার এখনো চট্টগ্রামে রয়েছে। মঘী সনের ব্যবহারও দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল। সে সময়ে আরাকানে মুসলিম জনবসতি বাড়ে। আরকান রাজসভায় কবি আলাওলের মতো বাংলা কবিদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে বাংলা সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি হয়। পদ্মাবতী আলাওলের অন্যতম কাব্য।

মোগল আমল

১৬৬৬ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম দখলের জন্য সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে। যুদ্ধে পর্তুগিজরা বিশ্বাসঘাতকতা করলে আরাকানীরা পরাজিত হয়। মোগল সেনাপতি উম্মদ খান চট্টগ্রামের ফৌজদার নিযুক্ত হয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। আরাকানীরা চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত হলেও প্রায়শ চট্টগ্রামে হামলা করতো। টমাস প্রোট নামে একজন ইংরেজ সেই সময় আরাকানীদের সঙ্গে যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই মারা পড়ে। ১৬৮৬ সালে কলকাতারপ্রতিষ্ঠাতা জব চার্নক ও ১৮৬৮ সালে কাপ্তেন হিথ চট্টগ্রাম দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হোন। ১৭১০ সাল পর্যন্ত হাজারী মনসবদাররাই ফৌজদার নিযুক্ত হলেও এরপর থেকে নায়েবরাই শাসনকার্য চালাতে থাকেন। ১৭২৫ সালে আরাকানীরা একেবারে চট্টগ্রাম শহরে ঢুকে পড়ে। তবে ৩০ হাজার মগ সৈন্য সেবারও সফল হতে পারে নি। চট্টগ্রাম দখলের পর মোগলরা পূর্বের পার্বত্য অঞ্চলে ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। ১৭১৩ সালে সমতলের বাসিন্দাদের সঙ্গে বাণিজ্য করার জন্য চাকমা সর্দার জালাল খান চুক্তি করেন। মোগলদের শাসনামলে চট্টগ্রামে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন ও বন্দর দখলের জন্য ইউরোপীয় সম্প্রদায় ছলে-বলে-কৌশলে চেষ্টা চালাতে থাকে।

মোগল আমলে চট্টগ্রামের ফৌজদারদের সহায়তা করার জন্য শাসন কাজে একজন বকশি এবং রাজস্ব কাজে একজন দেওয়ান নিয়োগ করা হত। মোগল আমলে চট্টগ্রামের ফৌজদারদের বকশি: বকশি-রা হলেনঃ মির্জা খলিল (১৬৬৬-১৬৬৮), মির্জা মুজাফফর খান (১৬৬৯-১৬৭০), মির মোহাম্মদ হোসেন (১৬৭২-১৬৭৯), মির জাফর (১৬৮০-১৬৮৬ ?) মোহাম্মদ হোসেন (১৬৮৭ ? – ১৬৮৮), মোহাম্মদ নইম (১৬৮৯-১৬৯৯), নূরুদ্দিন মোহাম্মদ (১৭০৪-১৭১৩)। ঐ সময়ে চট্টগ্রামের ফৌজদারদের অধীনে কার্যরত দেওয়ানরা হচ্ছেনঃ নরসিংহ রায় (১৬৬৬-১৬৬৮), ভগুনি দাস (১৬৬৯-১৬৭৭), হোসেন কলি খান ১৬৭৮-১৬৭৮) জয়নুল আবেদিন (১৬৮০-১৬৮৭), মোহাম্মদ খান (১৬৮৮-১৬৯৯), সোলতান মোহাম্মদ (১৭০৪-১৭০৬), মির আমজাদ (১৭০৭-১৭০৮), মনিরাম (১৭১১-১৭২৮), সুয়াজান পেশকার (প্রতিনিধি-মনিরাম) (১৭৩৬), মোকেম সিংহ (১৭৩৬), বাঙ্গালি লাল (১৭৩৭-৩৮), বরুণ দত্ত (১৭৩৯), লক্ষ্মীনারায়ন (১৭৪০-৪১), হমাসিংহ (১৭৪২-১৭৫১), চৈতন কিষণ (১৭৫২-১৭৫৩), বাঙ্গালি লাল (১৭৫৭-৫৮), রাম সিংহ (১৭৫৮-১৭৬০)।

১৬৭০ ও ১৭১০ সালে আরাকানীরা চট্টগ্রামের সীমান্তে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ১৭২৫ সালে প্রায় ৩০ হাজার মগ সৈন্য চট্টগ্রামে ঢুকে পড়ে চট্টগ্রামবাসীকে বিপদাপন্ন করে ফেলে। তবে শেষপর্যন্ত মোগলরা তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এই সময় মোগলদের কারণে ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দর কোনভাবেই দখল করতে পারে নি। মোগলরা পার্বত্য এলাকার অদিবাসীদের সঙ্গে, বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সদ্ভাব বজায় রাখে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় চট্টগ্রামে ইংরেজদের প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বাড়িয়ে দেয়। তারা এমনকী চট্টগ্রাম বন্দর তাদের কাছে হস্তান্তরের জন্য নবাব মীর জাফর আলীর ওপর চাপ প্রয়োহ করে। সফল না হয়ে পরে তারব মীর কাশিমকে একটি গোপন চুক্তির আওতায় নবাব বানায়। চুক্তি অনুসারে ১৭৬১ সালে মীর কাশিম বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম ইংরেজদের দিয়ে দেয়। চট্টগ্রামের শেষ ফৌজদার রেজা খাঁ সরকারীভাবে ভেরেলস্ট-এর হাতে চট্টগ্রামের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে চট্টগ্রামের চিফ ও তাদের দেওয়ান
সময়কাল চিফ দেওয়ান
১৭৬১-৬৪ হ্যারি ভেরেলস্ট গোকুলচাঁদ ঘোষাল
১৭৬৫ টমাস প্লেডেন রামশঙ্কর হাওলাদার
১৭৬৬-৬৮ ফ্রান্সিস চার্লটন রমাকান্ত বোস(৬৬-৬৭)
হরি মল্লিক (৬৮)
১৭৬৮-৬৯ জন রিড নন্দ দুলাল
১৭৬৯-৭০ টমাস লেইন নন্দ দুলাল
১৭৭০-৭২ ওয়ালটার উইলকিনস আথারাম হাওলাদার
১৭৭২-৭৩ চালর্স বেন্টলি
১৭৭৩-৭৪ জন রিড (দ্বিতীয় দফা) বৈঞ্চচরণ বোস
১৭৭৪(জানু‌-জুন) হেনরি ওয়াল্টার লালারাম রায় ও
রামলোচন মিত্র
১৭৭৪(জুন-নভে) হেনরি গুডউইর মদন মোহন হালদার
১৭৭৪-৭৫ উইলিয়াম কোটস
১৭৭৫-৭৬ নাথানিয়েল বেইটম্যান
১৭৭৬-৭৮ ফ্রান্সিস ল
১৭৭৮-৮১ রিচার্ড সামনার
১৭৮১-৮২ জন বুলার
১৭৮২-৮৫ জেসম ইরউইন কিঞ্জলকিশোর চক্রবর্তী
১৭৮৫(আগস্ট‌-সেপ্টে) জন বুলার (দ্বিতীয় দফা) কালীচরণ রায় (৮৫-৯০)
১৭৮৫-৮৬ চার্লস ক্রফটেস
১৭৮৬(সেপ্টে-অক্টো) জর্জ ডডেসওয়েল
১৭৮৬-৯৩ শিয়ারম্যান বার্ড গৌরিশঙ্কর রায় (৯০-৯৫)

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। ২৯ মার্চব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ৩৪ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনী বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহের খবর চট্টগ্রামে এসে পৌঁছালে ২, ৩ ও ৪ নম্বর কোম্পানির সৈন্যরাও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ১৮৫৭ সালের ১৮ ণভেম্বর সিপাহীরা কারাগারের বন্দীদের মুক্ত করার মাধ্যমে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটায়। হাবিলদার রজব আলী ও সিপাহী জামাল খান এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। সিপাহীরা কোন ইউরোপীয় বা স্থানীয় নাগরিকের কোন ক্ষতি করে নি। ১৯ তারিখে তারা চট্টগ্রাম ত্যাগ করে। উদ্দশ্য ছির ঢাকার বিদ্রোহী ৭৩ নম্বর কোম্পানির সঙ্গে যোগ দেওয়া। এখবর পেয়ে ইংরেজ কোপানি কুমিল্লার কোষাগারের ঠাকা ঢাকায় সরিয়ে নওয়া, নৌবাহিনী তলব করা সহ নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২২ নভেম্বর ঢাকার বিদ্রোহীরা পরাজয় স্বীকার করে। এখবর পেয়ে চট্টগ্রামের সিপাহীরা উদয়পুরের দিকে যেতে চেষ্টা করে। ইংরেজ কোম্পানির অনুরোধে ত্রিপুরা রাজ তাদের বাঁধা দেন। এভাবে বিভিন্ন স্থানে লড়াই সংগ্রাম এবং রসদের অভাবে বিদ্রোহীরা অনেকখানি কাবু হয়ে পড়ে। শেষ ১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি সিলেটের মনিপুরে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে এক লড়াই-এ চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের অবসান হয়। বিভিন্ন লড়াই-এ মোট ২০৬ জন সিপাহী শহীদ হোন ও বাকীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। সিপাহীরা যে ২০২ জন বন্দীকে মুক্ত করে তার ১৬৭ জনই পরে আবার বন্দী হয়। ইংরেজরা মোট ৫জন সিপাহীকে বন্দী করে যাদের একজনের মৃত্যুদন্ড ও বাকীদের নানান মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৮৫৭ -এর চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই বিদ্রোহে দমনে ইংরেজ বাহিনী স্থানীয় জমিদার বা অন্য কারো কোন সহযোগিতা পায় নি। চট্টগ্রামবাসী সেবার প্রমাণ করেছিল তারা বস্তুত রাজাকার নয়।

চট্টগ্রাম বিমান বন্দর, ১৯৪৪১৮৯২, ১৮৯৬ ও ১৯০১ সালে চট্টগ্রামকে বাংলা থেকে পৃথক করে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ইংরেজ সরকার। এই প্রচেষ্ঠার প্রতিরোধে চট্টগ্রামে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। একটি ১৮৯৫-৯৬ সালে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন জোরদার ও ১৯০২ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্মিলন নামে একটি রাজনৈতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠা। ১৯০২ সালের ২৯ ও ৩০ মার্চ প্যারেড ময়দান-এ সংস্থার প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন যাত্রা মোহন সেন।

বঙ্গভঙ্গ

চট্টগ্রাম নামের উৎস

বৈচিত্রময়ী চট্টগ্রামের নামও বৈচিত্রে ভরা। খ্রিষ্টীয় দশক শতকের আগে চট্টগ্রাম নামের অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ চট্টগ্রাম নামের কোন উৎসের সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই দেখা যায় যে, সুপ্রাচীনকাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পরিব্রাজক, ভৌগোলিক এবং পন্ডিতগণের লিখিত বিবরণে, অঙ্কিত মানচিত্রে, এখানকার শাসক গৌড়ের সুলতান ও রাজাদের মুদ্রায় চট্টগ্রামকে বহু নামে খ্যাত করেছিলেন। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৪৮টি নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‌‌-সুহ্মদেশ, ক্লীং, রম্যভূমি, চাতগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চক্রশালা, শ্রীচট্টল, চাটিগাঁ, পুস্পপুর, চিতাগঞ্জ, চাটিগ্রাম ইত্যাদি।[৫] কিন্তু কোন নামের সঙ্গে পাঁচজন একমত হন না। সে সব নাম থেকে চট্টগ্রামের নাম উৎপত্তির সম্ভাব্য ও চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে ধ্বনিমিলযুক্ত তেরটি নামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

  • চৈত্যগ্রাম: চট্টগ্রামের বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অভিমত এই যে, প্রাচীনকালে এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ চৈত্য অবস্থিত ছিল বলে এ স্থানের নাম হয় চৈত্যগ্রাম। চৈত্য অর্থ বৌদ্ধমন্দির কেয়াং বা বিহার। এই চৈত্যের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয় বলে চৈত্যগ্রাম নামের উদ্ভব হয়। পরবর্তীকালে চৈত্যগ্রাম নাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়।
  • চতুঃগ্রাম: ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার লেখক ও’মলি সাহেবের মতে, সংস্কৃত চতুঃগ্রাম শব্দ থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। চতুঃ অর্থ চার। চতুঃ শব্দের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয়ে চতুঃগ্রাম হয়। চতুঃগ্রাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়।
  • চট্টল: চট্টগ্রামের তান্ত্রিক ও পৌরাণিক নাম ছিল চট্টল। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণগ্রন্থে চট্টল নামের উল্লেখ দেখা যায়।

দেবী পুরাণ চন্ডিকা খন্ডেঃ
বিন্ধ্য পর্বতমারভ্য বিন্ধ্যাচলাবধি প্রিয়ে,
অশ্বাক্রান্তেতি বিখ্যাতং বিষ্ণুলোকেষু দুর্লভং,
বিন্দু পর্বত মারভ্য যাবৎ চট্টল বাসিনী,
চুড়ামণি তন্ত্রেঃ
চট্টলে দক্ষ বাহুর্যে ভৈরবচন্দ্র শেখরঃ,
ব্যক্ত রূপা ভগবতী ভবানীতন্ত্র দেবতা।
বারাহী তন্ত্রেঃ
চট্টলে দক্ষিণোবাহু ভৈরবচন্দ্র শেখরঃ,
সস্যৈব কতিদেশস্থো বিরূপাক্ষ মহেশ্বর।
কলৌস্থানঞ্চ সর্ব্বোষাৎ দেষানাৎ চট্টল শুভে।
যোগিনী তন্ত্রেঃ
সাদ্ধ ত্রিকোটি দেবানাৎ বসতিশ্চৎ চট্টল শুভে।
ত্রিপুরার রাজমালাঃগ্রন্থকারের মতে প্রাচীনকালে এখানে চট্টভট্ট নামক কুলীন ব্রাহ্মণ জাতির নিবাস ছিল বলে এই স্থানের নামকরণ হয়েছিল চট্টল।

  • শ্যাৎগাঙ্গ: বার্ণোলী সাহেবের মতে আরবি শ্যাৎগাঙ্গ শব্দ বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব হয়েছে। শ্যাৎ অর্থ বদ্বীপ, গাঙ্গ অর্থ গঙ্গানদী। চট্টগ্রাম গঙ্গানদীর মোহনাস্থিত বদ্বীপ- প্রাচীন আরব বণিক-নাবিকদের এই ধারণা থেকে এর নামকরণ করা হয়েছিল শ্যাৎগাঙ্গ। পরবর্তীকালে শ্যাৎগাঙ্গ নাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি।
  • চিৎ-তৌৎ-গৌং: খ্রিষ্টীয় দশম শতকের মধ্যবর্তীকাল অবধি ফেনী নদীর দক্ষিণ তীর থেকে নাফ নদীর উত্তর তীরের মধ্যবর্তী ভূভাগটির চট্টগ্রাম নাম প্রচলিত ছিল না। তখন এই ভূরাজ্যটি আরাকানরাজ্যভূক্ত ছিল। তৎকালীন আরাকানরাজ সুলতইং চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে নিজ অধিকৃত রাজ্যাংশের উক্ত ভূভাগের বিদ্রোহী ‘সুরতন’কে ( সুলতানকে ) দমন করতে এসে সসৈন্য আধুনিক সীতাকুন্ড থানার কুমিরার কাউনিয়া ছড়ার দক্ষিণ তীর অবধি অগ্রসর হন এবং সেখানে একটি পাথরের বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করে তাতে চিৎ-তৌৎ-গৌং (যুদ্ধ করা অনুচিত) বাণী উৎকীর্ণ করে স্বদেশে ফিরে যান। তখন থেকে এই ভূভাগটি চিৎ-তৌৎ-গৌং নামে খ্যাত হয়। আরাকানের প্রাচীন রাজাদের ইতিহাস রাজোয়াং সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। কালক্রমে চিৎ-তৌৎ-গৌং নাম বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব হয়।
  • চাটিগ্রাম: সম্ভবত রাজোয়াং বর্ণিত উপরোক্ত চিৎ-তৌৎ-গৌং নামটি মধ্যযুগে বিবর্তিত ও সংস্কৃতায়িত হয়ে চাটিগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়। গৌড়ের রাজা গণেশ দনুজমর্দন দেবের ১৩৩৯-১৩৪০ শকাব্দে ও রাজা মহেন্দ্র দেবের ১৩৪০ শকাব্দে চট্টগ্রামে তৈরি মুদ্রায় টাকশালের নাম চাটিগ্রাম উল্লেখ দেখা যায়। বাংলার সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্‌ ( ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি. ) ও সৈয়দ নাসির উদ্দিন নশরত শাহ্‌র আমলে (১৫১৯-১৫৩২ খ্রি.) কবীন্দ্র পরমেশ্বরবিরচিত পরাগলী মহাভারতে এবং বৈষ্ণব সাহিত্য চৈতন্য-ভাগবত প্রভৃতিতে চাটিগ্রাম নামের উল্লেখ রয়েছে।
  • চাটিগাঁ: চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে চট্টগ্রাম ছিল জ্বীনপরী অধ্যুষিত দেশ। পীর বদর শাহ্‌ এখানে আগমন করে অলৌকিক চাটির (মৃৎ-প্রদীপ) আলোর তেজের সাহায্যে জ্বীনপরী বিতাড়িত করার ফলে এই স্থানের নাম হয় চাটিগাঁ।
  • চতকাঁও/চাটগাঁও: চাটিগাঁর ফার্সি রূপ চতকাঁও বা চাটগাঁও। বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ্‌র (১৩৮৯-১৪০৯ খ্রি.) ও সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ্‌র (১৪১৮-১৪৩২ খ্রি.) মুদ্রায় চতকাঁও টাকশালের নাম উৎকীর্ণ দেখা যায়। ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে লিখিত সুবিখ্যাত সুফি সাধক মুজাফফর শামস বলখির চিঠিতে চাটগাঁও নামের উল্লেখ দেখা যায়।
  • সুদকাওয়ান: আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত মরক্কোর অধিবাসী ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বঙ্গ ও আসাম পরিভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামকে সুদকাওয়ান নামে উল্লেখ করেন।
  • চাটিকিয়াং: চীন দেশ থেকে ১৪০৯, ১৪১২, ১৪১৫, ১৪২২ বা ১৪২৩, ১৪২৯ ও ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে মোট সাতবার বাংলার সুলতানদের দরবারে রাজদূত প্রেরিত হয়েছিল। তাদের লিখিত বিবরণে চট্টগ্রামকে চাটিকিয়াং রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
  • শাতজাম: তুর্কি সুলতান সোলায়মানের রেডফ্লিটের ক্যাপ্টেন সিদি আলী চেহেলভি ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে জাহাজযোগে ভারত মহাসাগরীয় দেশসমূহ পরিভ্রমণ করেন। এবং এ সময় তিনি আরাকান থেকে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূল হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামের নাম শাতজাম নামে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
  • চার্টিগান: পরিব্রাজক রালফ ফিচ ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পরিভ্রমণ করেন। তাঁর লিখিত ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামের নাম চার্টিগান রূপে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
  • জেটিগা: ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ফ্যান্ডেন ব্রুক অঙ্কিত মানচিত্রে চট্টগ্রামের নাম জেটিগা রূপে লিখিত আছে।

হাজার বছর ধরে : ঘটনাপঞ্জি

সময়কাল বর্ণনা
৬-৭ শতক বর্মী ইতিহাস-পঞ্জি অনুসারে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ রাজাদের শাসনাধীন ছিল।
৯৫৩-৯৫৭ আরাকান রাজা ছুলা-তাইং-ছন্দ্র চট্টগ্রাম অধিকার ও শাসন করেন।
১০ শতক আরব বণিকদের চট্টগ্রাম আগমনের সূচনা।
১১ শতক অনরহ্তা (১০৪৪-৭৭) নামে একজন বর্মী রাজা চট্টগ্রামে আসেন।
১১৫৩ আরব ভৌগোলিক আল-ইদ্রিসি চট্টগ্রামে আসেন বলে ধারণা।
১২৪৩ ত্রিপুরার মহারাজ দামোদর দেব ১২৪০-এর দিকে চট্টগ্রামে রাজত্ব করেন। তারনামাঙ্কিত ১২৪৩ সালের তাম্রশাসন থেকে এর সমর্থন মেলে।
১২৯১-৯২ ইতালীয় পরিব্রাজক মার্কো পোলোর চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন।
আনু. ১৩৪০ ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বকালে সেনাপতি কদল খাঁ গাজী আরাকানিদেরবিতাড়িত করেন। চট্টগ্রামে সর্ব প্রথম মুসলিম শাসন কায়েম।
১৩৪৫-৪৬ আরব বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতার চট্টগ্রাম সফর ।
১৩৫০ সমুদ্র পারের খুব সুন্দর স্থান হিসেবে চট্টগ্রামের পরিচিতি লাভ ।
১৪০০ চীন সম্রাটের একজন দূত ৬০টি বড় বড় জাহাজ নিয়ে যোগাযোগ ও বাণিজ্য করতে চট্টগ্রাম আগমন।
১৪০০ ভেনিসীয় পর্যটক নিক্কোলো দে কন্তি চট্টগ্রাম হয়ে আরাকান ভ্রমণ করেন।
১৫ শতক আরাকান রাজ্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।
১৪০৬ চীনা বিবরণকার মা হুয়ান চট্টগ্রাম সফর করেন।
১৪১৫ একটি চীন রাজপ্রতিনিধিদল চট্টগ্রামে আসেন। ঐ দলে বিখ্যাত চীনা বিবরণ লেখক মা হুয়ানও ছিলেন।
১৪১৭ রাজা গণেশ ওরফে দনুজ মর্দন দেব-এর নামাঙ্কিত ১৪১৭ সালের একটি মুদ্রায় ‘চাটিগ্রাম’ নাম খোদিত দেখা যায়।
১৪১৭ চট্টগ্রাম ছিল রাজা মহেন্দ্র দেবের অধিকারে।
১৪৭৪ রাস্তি খান হাটহাজারিতে সমজিদ নির্মাণ করেন।
১৪৮৭ জয়চন্দ্র চক্রশালার অধিপতি হন।
১৬ শতক এই শতকের প্রথম দিকে গৌড়ের রাজা আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, ত্রিপুরার রাজা ধন্যমাণিক্য ও আরাকানের রাজা মিনুয়াজা- এ তিন শক্তির ত্রিমুখী লড়াই চলে চট্টগ্রামকে করায়ত্ত করার জন্য।
১৫০৫ জালাল হালভি চট্টগ্রাম সফল করেন।
১৫১৩ ত্রিপুরার রাজা ধন্যমাণিক্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
১৫১৩ গৌড়েশ্বর হোসেন শাহ চট্টগ্রামের উত্তরাংশ দখল করেন।
১৫১৩-১৭ চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে ধন্যমাণিক্য ও হোসেন শাহের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলে।
১৫১৭-১৮ হোসেন শাহ সমগ্র চট্টগ্রাম ও আরাকানের উত্তরাংশ করায়ত্ত করেন।
১৫১৭ পর্তুগিজ ক্যাপটেন জোয়া দা সিলভেইরা প্রথম চট্টগ্রাম বন্দরে তার ‘লুপু সোয়ান’ জাহাজ ভেড়ান।
১৫২২ ত্রিপুরা-রাজ দেবমাণিক্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
১৫২৪ হোসেন শাহের পুত্র নসর উদ্দিন নসরত শাত চট্টগ্রাম জয় করেন।
১৫২৬ পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন সাজ পেরেইরা চট্টগ্রাম সফর করেন।
১৫৩৩ পর্তুগিজ ক্যাপ্টেন আলফনসো দে মেল্লো চট্টগ্রাম আসেন এবং পাঠান প্রশাসক হামজাখানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৫৩৭ সুলতান মাহমুদ শাহ শেরশাহের বিরুদ্ধে পর্তুগিজদের সমর্থন আদায়ের জন্য নানোফার্নান্দেজ ফ্রেইরেকে চট্টগ্রামের শুল্ক ভবনের প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করেন। এবং পর্তুগিজদের চট্টগ্রামে কারখানা নির্মাণের অনুমতি দেন।
১৫৩৮-৪৫ চট্টগ্রাম ছিল সম্রাট শেরশাহের অধীনে।
১৫৩৮-৮০ চট্টগ্রাম ছিল মূলত আফগান শামসাধীন।
১৫৪২ আরাকানরাজ চান্দিলা রাকাকে চট্টগ্রামের শাসক নিযুক্ত করেন।
১৫৫৪ তুর্কি সুলতান প্রেরিত নৌ-অধ্য ক্যাপটেন সিদি আলী চেহেলভির চট্টগ্রাম আগমন।
১৫৫৫ মাহমুদ খান চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
১৫৫৬ ত্রিপুরার রাজা বিজয় মাণিক্য চট্টগ্রাম আক্রমণ করে সাময়িকভাবে দখল করে নেন। ১৫৬৬ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ত্রিপুরা অধিকার বলবৎ থাকে।
১৫৬০-৮১ চট্টগ্রাম বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে।
১৫৬৭ সিজার ফ্রেদেরিকো চট্টগ্রাম সফর করেন।
১৫৬৭ চট্টগ্রামের শাসক নরসত খান আরকানিদের হাতে নিহত হন।
১৫৭৩ দাউদ কররানি চট্টগ্রাম অধিকার করেন।
১৫৮১-১৬৬৬ চট্টগ্রাম মূলত ছিল আরাকান রাজাদের শাসনাধীন।
১৫৮৫ রেলফ ফিচ চট্টগ্রামে অবস্থান করেন।
১৫৮৫ পর্তুগিজদের সাহায্য নিয়ে আরাকানরাজ পুনরায় চট্টগ্রাম করায়ত্ত করেন।
১৫৮৫-১৭৬০ চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল ও জলভাগে পর্তুগিজদের কর্তৃত্ত বজায় ছিল।
১৫৯০ আন্তেনিও গোদিনহোর নেতৃত্বে ভাড়াটে পর্তৃগিজ সেনারা সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম দখল।
১৫৯৯ চট্টগ্রামের শাসনকর্তা বৌদ্ধ ধর্মপন্ডিত মহাপিন্ন্যগ্য-র মৃত্যু।
১৬০১ চট্টগ্রাম থেকে মিন রাজাগী-র মুদ্রা চালু করা হয়।
১৬০২ কারভালহো-র নেতৃত্বে পর্তুগিজরা সন্দ্বীপ দখল করে এবং চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে।
১৬০২ পর্তুগিজরা চট্টগ্রামের শাসনকর্তা আরকান রাজার সভাসদ সিনাবাদিকে হত্যা করে।
১৬০৫ অধিকৃত জায়গা থেকে পর্তুগিজদের উচ্ছেদ করা হয়। এবং আরকানরাজ সন্দ্বীপপুনর্দখল করেন।
১৬০৭ ফরাসি পরিব্রাজক ডি লাভাল চট্টগ্রামে অবস্থান করেন।
১৬১৪ মেং সোয়া পিউ চট্টগ্রামের শাসক নিযুক্ত হন।
১৬১৬ কাসিম খানের চট্টগ্রাম দখল অভিযান ব্যর্ত হয়।
১৬২১ ইব্রাহিম খানের চট্টগ্রাম দখল অভিযান ব্যর্ত হয়।
১৬২৮ রাজ-বিদ্রোহী আরকান সেনাপতি মুকুট রায় চট্টগ্রাম দখল করেন এবং দিল্লির সম্রাটের কাছে একে হস্তান্তর করেন।
১৬৩০-৩৪ পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানরিক চট্টগ্রামে অবস্থান করেন।
১৬৬০ সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজা বর্মা পলায়নকালে চট্টগ্রাম-এর ওপর দিয়ে যান।
১৬৬৬ শায়েস্তা খানের সেনাবাহিনী আরাকানের রাজাদের হাত থেকে চট্টগ্রাম ছিনিয়ে নিলে এখানে মোগল আদিপাত্য বিস্তৃত হয়। নওয়াব বুজুর্গ উম্মেদ খান চট্টগ্রামের প্রথম তোগল ফৌজদার (জেলা-অধিকর্তা) নিযুক্ত হন। এই সময় চট্টগ্রামের নাম রাখা হয় ইসলামাবাদ।
১৬৬৯ আন্দরকিল্লায় জামে সমজিদ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।
১৬৮২ হামজা খানের সমজিদ নির্মিত হয়।
১৬৮৫ অ্যাডমিরাল নিকলসন চট্টগ্রাম অধিকারের প্রচেষ্টা চালান।
১৬৮৮ কমান্ডার হিথ চট্টগ্রাম দখলের প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।
১৭১৩ ওয়ালি বেগ খান চট্টগ্রামে সমজিদ নির্মাণ করেন।
১৭১৯/১৭২৩ মোগল শাসক এয়াসিন খান কদম মোবারক সমজিদ নির্মাণ করেন।
১৭৪৭ প্রথম ফরাসি ফ্যাক্টরি বিল্ডিং নির্মিত হয়।
১৭৫১ ফরাসিরা নোতরদাম-দে-গার লুপ আ কঁ কঁ নামে একটি উপাসনালয় নির্মাণ করে।
১৭৬০ ২৭ সেপ্টেম্বরের সন্ধির শর্ত অনুসারে মির কাশিম মেদিনীপুর ও বর্ধমানের সঙ্গে চট্টগ্রামকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দেন। চট্টগ্রামের চিফ হয়ে আসেন হেরি ভেরেলেষ্ট। তাঁর সঙ্গে আসেন কাউন্সিল সদস্য টমাস রামবোল্ড ও বেন ডলফ। এঁদের সঙ্গে সহকারী হিসেবে আসেন ওয়ালটার উইলফেস ও দেওয়ান হিসেবে আসেন গোকুলচন্দ্র ঘোষল।
১৭৬১ ৫ জানুয়ারি: হেরি ভেরেলেস্ট চিফ হিসেবে নাবাব রেজা খাঁ-র কাছ থেকে ইসলামবাদের (চট্টগ্রামের) দায়িত্ব ভার বুঝে নেন।
১৭৬১ চট্টগ্রামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনি প্রথম কারখানা নির্মাণ করে।
১৭৬৫ চট্টগ্রামে প্রথম জরিপ কাজ শুরু হয়।
১৭৭২ রাজস্ব বোর্ড গঠন করা হয়।
১৭৭৪ ১২ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে দাস প্রথা রহিত হয়।
১৭৭৭ নভেম্বর: চট্টগ্রামের পার্বত্য প্রদেশে বসবাসরত কুকি উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়।
১৭৭৮ চট্টগ্রাম-ঢাকা সড়কের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায়।
১৭৮৫ বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ স্যার উইলিয়াম জোনস চার মাস চট্টগ্রামে অবস্থান করেন।
১৭৯০ ২৮ আগস্ট: চট্টগ্রামে কোর্ট অব ওয়ার্ডস প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৭৯১ [কদম মোবারক সমজিদ] নির্মিত হয়।
১৭৯৩ বিচারপতি স্যার এলিজাহ ইস্পেই চট্টগ্রাম সফর করেন।
১৭৯৪ চট্টগ্রাম ও কলকাতার মধ্যে প্রথম দৈনন্দিন ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়। কলকাতা থেকে ৬ দিনে চিঠি আসতে থাকে।
১৭৯৮ ক্যাপ্টেন কক্স কক্সবাজার প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮৩৬ জানুয়ারিতে প্রথম ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই স্কুলটিই পরবর্তীকালে বর্তমান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত।
১৮৩৯ ডিসেম্বর ২৪: চট্টগ্রামে প্রথম গির্জা স্থাপিত হয়।
১৮৪০ ব্রিটিশ রাজ্যের পে এ স্কোনস পাইওনিয়ার টি গার্ডেন স্থাপন করলে চট্টগ্রামে প্রথম চা-আবাদের সুচনা হয়।
১৮৪১ সবচেয়ে প্রাচীন ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট প্লাসিডস স্কুল স্থাপিত হয়।
১৮৫৪ মহকুমা ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার মহকুমা গঠিত হয়।
১৮৫৪-৫৬ কলকাতা থেকে সড়ক পথে বার্মা যাওয়ার সুবিধার জন্য ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড নতুনভাবে নির্মিত হয়।
১৮৫৭ ১৯ নভেম্বর: ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ‘সিপাহি বিদ্রোহে চট্টগ্রাম তিনটি সামরিক কোম্পানি অংশ নেয় এবং তেরজুরি লুট হয়।
১৮৬০ জুন ২০ চট্টগ্রাম পৌরসভা বা মিউনিসিপালটির যাত্রা শুরু ; আগস্ট: পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা জেলার মর্যাদা দেওয়া হয়।
১৮৬১ কুকি উপজাতীয় সর্দার রতন পাইয়ার বিরুদ্ধে অভিযান।
১৮৬৩ ১ জুন মিউনিসিপ্যাল কমিটি সংগঠিত হয়।
১৮৬৯ এপ্রিল ১: কক্সবাজার টাউন কমিটি গঠিত হয়।
১৮৬৯ প্রথম কলেজ স্থাপিত হয়। এটিই পরবর্তীকালে বর্তমান চট্টগ্রাম কলেজের রূপ নিয়েছে।
১৮৭১ কুকি হামলা।
১৮৭৪ চট্টগ্রাম মাদ্রসা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং বর্তমানে হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজ নামে পরিচিত।
১৮৭৫ জানুয়ারি ২৯: চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের জম্ন হয়। কমলাকান্ত সেন ছিলেন প্রথম সভাপতি।
১৮৭৬ চট্টগ্রাম কলেজ স্থাপিত হয়।
১৮৭৬ ভয়াবহ সাইকোন হয় এবং কলেরায় ১৫ হাজার লোক মারা পড়ে।
১৮৭৮ ২৩ আগষ্ট: চট্টগ্রাম ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৭৮ ডা. খাস্তগীর সরকারী বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়।
১৮৮৪ চট্টগ্রাম জেলা বোর্ড গঠিত হয়।
১৮৮৫ কাজেম আলী স্কুল স্থাপিত হয়।
১৮৮৬ এপ্রিল ১৪: নব বিধান ব্রাহ্মমন্দির নির্মিত হয়।
১৮৮৬ সীতাকুন্ড পাহাড়ে প্রস্তর যুগের অশ্মীভুত কাঠের কৃপাণ আবিস্কৃত হয়।
১৮৮৭ মে ৩: চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের কাজ আরম্ভ হয়।
১৮৮৭ চট্টগ্রাম বন্দর কমিশনের বোর্ড গঠিত হয়।
১৮৮৮ কুকি হামলা।
১৮৯০ কুকিদের বিরুদ্ধে দমনমূলক অভিযান পরিচালনা।
১৮৯২ ডিসেম্বর ২৮: চট্টগ্রামে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
১৮৯৩ বন বিভাগের প্রধান কার্যালয় রাঙ্গামাটি থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়।
১৮৯৪ চট্টগ্রাম আদালত ভবন নির্মিত হয়।
১৮৯৫ জুলাই ১: চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপিত হলে বাস্পচালিত রেল ইঞ্জিন কুমিল্লা অভিমুখে প্রথম যাত্রা মুরু করে।
১৮৯৫ নভেম্বর ৩: চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত রেল পথের সূচনা হয়।
১৮৯৭ চট্টগ্রাম ঘুর্ণিঝড় ও মারাত্মক কলেরার কবলে পড়ে এবং কলেরায় ২১ হাজার লোকের মৃত্যু হয়।
১৮৯৭ মার্চ ১৭: চট্টগ্রামের কমিশনার সি, স্ক্রিন নতুন হাসপাতালের দ্বার উন্মুক্ত করেন।
১৮৯৯ সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য প্রথম জেটি নির্মাণ করা হয় এবং তা যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বাস্পচালিত জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে শুরু করে।
১৯০০ মার্চ ১৩: শ্যামাকান্ত (শ্রীমৎ সোহং স্বামী) চট্টগ্রামে তাঁর সার্কাস প্রদর্শন শুরু করেন।
১৯০১ প্রথম পাবলিক হাসপাতাল (চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল) প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০২ সীতাকুন্ডে পানির কল স্থাপিত হয়।
১৯০৩ চট্টগ্রাম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০৪ জানুয়ারী: চট্টগ্রামে বাকল্যান্ড হল পাবলিক লাইব্রেরি নামে প্রথম সাধারণ পাঠাগার বা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এর নাম হয় মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরি। বর্তমানে এটি সিটি কর্পোরেশন গ্রন্থাগার নামে পরিচিত।
১৯০৪ জানুয়ারি ১৭: চট্টগ্রামকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করায় বিরাট প্রতিবাদ সভা হয়।
১৯০৪ জুলাই ২০: রঙ্গমহাল হিলে তুলা গাছের নিচে ধ্যানী বুদধমুর্তি পাওয়া যায়। সেটি পরে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০৪ ১৬ ফেব্র“য়ারি: লর্ড কার্জন চট্টগ্রামে পূর্বাঞ্চলের (আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে লাইন) ৭৪০ মাইল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা (চট্টগ্রাম থেকে আপার আসাম পর্যন্ত) উদ্ধোধন করেন।
১৯০৫ আগষ্ট ৭: বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাব চট্টগ্রামেও বিস্তৃত হয়।
১৯০৫ অক্টোবর ২৯: রেল কর্মকর্তা মি. জেমস চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মোটর কার চালান।
১৯০৫ ডিসেম্বর ১১: ঘোড়া গাড়ির ধর্মঘট হয়।
১৯০৫ লেফটেনান্ট গভর্নর মি. ফুলার প্রদেশের গভর্নর হয়ে চট্টগ্রাম আসেন এবং ঘোড়ায় চড়ে হাসপাতাল, কলেজ, স্কুল পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনের বড় সভায় স্থির হয় যে ফুলার সাহেবকে অভিনন্দন জানানো হবে না।
১৯০৬ জানুয়ারি ১২: মাইজভান্ডারের প্রসিদ্ধ ফকির আহমদ উল্লাহ সাহেব পরলোকে গমন করেন।
১৯০৬ মার্চ ১৫: স্বদেশী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিদেশী কাপড়, লবণ ও চিনি বর্জন আন্দোলন শুরু হয়। স্বদেশী সঙ্গীতসহ শোভাযাত্রা ও সভা-সমিতির সূত্রপাত হয়।
১৯০৬ নভেম্বর ২৭: সাপ্তাহিক ‘পঞ্চজন্যৎ পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে।
১৯০৭ জুন ১৭: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চট্টগ্রাম শুভাগমন। জুন ২৮: কমল বাবুর থিয়েটার হলে (সদরঘাটস্থ বিশ্বম্ভর ভবন) রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা করেন। আগষ্ট ২: চট্টগ্রামে আর্যসঙ্গীত সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯০৯ মুসলিম হাই স্কুল স্থাপিত হয়।
১৯১১ আগষ্ট ১৫: চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষদ গঠিত হয়।
১৯১২ এপ্রিল ৭: বঙ্গীয় প্রাদেশিক সন্মেলনের অধিবেশন হয় চট্টগ্রামে। সভাপতিত্ব করেন এ. রসুল।
১৯১২ আগষ্ট ১: বাংলার প্রথম গভর্নর লর্ড কারমাইকেল সস্ত্রীক চট্টগ্রামে আসেন।
১৯১৩ চট্টগ্রাম সর্কিট হাউস নির্মিত হয়।
১৯১৩ মার্চ ২২-২৩: বঙ্গীয় সহিত্য সম্মিলনের অধিবেশন হয়। সভাপতিত্ব করেন অয়কুমার সরকার। হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যােিনাদ, বিহারীলাল সরকার, বিপিনচন্দ্র পাল, বিনয়কুমার সরকার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ সাহিত্যিক এতে যোগ দেন।
১৯১৩ দারুল উলুম মাদ্রাসা স্থাপিত হয়।
১৯১৫ ২৬ মার্চ: টাউন হল বিল্ডিং কমিটি গঠিত হয়।
১৯১৫ পুলিশ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯১৬ শহরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা হয়।
১৯১৬ লর্ড কারমাইকেল চট্টগ্রামে আসেন।
১৯১৮ বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯১৮ বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন মওলানা আকরাম খাঁ।
১৯১৮ বঙ্গীয় মুসলমান ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
১৯১৯ নভেম্ভর ২৯: সকাল ১১.৪৫ মিনিটে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের আকাশে বিমান উড়তে দেখা যায়।
১৯১৬ নভেম্ভর ১৯: রায় শরৎচন্দ্র দাস বাহাদুর টাউন হলের ভিত্তি স্থাপন করেন। হলের নামকরণ করা হয়: যাত্রামোহন সেন হল।
১৯২০ ফেব্র“য়ারি ৮: নবীনচন্দ্র দত্ত রায় বাহাদুর যাত্রামোহন সেন হলের দ্বার উন্মোচন করেন।
১৯২০ ফেব্র“য়ারি ১১: চট্টগ্রামের কষি ও শিল্প প্রদর্শনী খোলা হয়।
১৯২০ চট্টগ্রাম অসহযোগ আন্দোলনের প্রবল ঢেউ বয়ে যায়।
১৯২০ চট্টগ্রাম শহরে মোটরগাড়ি চলাচল শুরু করে।
১৯২১ প্রবর্তক সংঘ স্থাপিত হয়।
১৯২৪ চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারি পর্যন্ত ভাড়াটে ট্যাক্সি চলাচল শুরু করে।
১৯২৪ চট্টগ্রামে ব্রতী বালক বা বয় স্কাউট সংঘঠনের কার্যক্রম শুরু হয়।
১৯২৪ ফয়’জ লেক নামে পরিচিত কৃত্রিম-হ্রদটি তৈরি করা হয়।
১৯২৫ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল স্কুল চালু হয়। রেলওয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯২৫ মুসলিম হল প্রতিষ্ঠিত হয় আন্দরকিল্লা এলাকায়। ১৯৫৩ সালে কে সি দে রোডে বর্তমান মুসলিম ইনস্টিটিউট হল নির্মিত হয়।
১৯২৫ চট্টগ্রাম পৌরসভা চট্টগ্রাম শহরে ছেলেদের জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে। ১৯২৮ সালে তা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ১৯৩৩ সালে মেয়েদের প্রাথমিক শিা বাধ্যতামূলক করা হয়
১৯২৬ ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রামকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
১৯২৬ চট্টগ্রামে নিয়মিত চলচিত্র প্রদর্শন শুরু হয়।
১৯২৬ জুলাই: কবি কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে আসেন। এরপর তিনি ১৯২৯ ও ১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম এসেছিলেন।
১৯২৬ সরোজিনী নাইডু চট্টগ্রাম সফর করেন।
১৯২৭ আনোয়ারার ঝিয়রী গ্রামে ৬১টি বুদ্ধমুর্তিসহ সপ্তম ও দশম শতকের বহু পুরাকীর্তি আবিস্কৃত।
১৯২৭ মার্চ ২৩: চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালূ হয়।
১৯২৮ চট্টগ্রামে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিা প্রবর্তিত হয়।
১৯২৯ চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারি পর্যন্ত রেলপথ চালু হয়। পরের বছর তা নাজিরহাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।
১৯৩০ ১৮ এপ্রিল মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও সশস্ত্র অভ্যুঙ্খান সংঘটিত হয়।
১৯৩১ ৪ জুন: কর্ণফুলী নদীর উপরে কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু উদ্বোধন করা হয়।
১৯৩৩ রাউজান সাহিত্য সন্মেলনে কবি নজরুল ও আবদুল কাদির প্রমুখ অংশ নেন।
১৯৩৪ চট্টগ্রামে প্রথম হোমিওপ্যাথিক কলেজ স্থাপিত হয়।
১৯৩৪ সেপ্টেম্বর ২: চট্টগ্রাম সাহিত্য মজলিশ গঠিত হয়।
১৯৩৭ নভেম্বর: ইংলন্ডের ইলিংটন কোরিস্থিয়ান দল চট্টগ্রামে ফুটবল খেলতে আসে। চট্টগ্রাম বাছাই একাদশের সঙ্গে তাদের খেলা হয়।
১৯৩৭ চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি গঠিত হয়।
১৯৩৭ চট্টগ্রামে পূরবী সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৩৮ প্রথম কাপড়ের কল চালু হয়।
১৯৩৯ স্যার আশুতোষ কলেজ, কানুনগোপড়া স্থাপিত হয়।
১৯৩৯ ধলঘাটে চট্টগ্রাম জেলা কৃষক সমিতির প্রথম সম্মেলন হয়।
১৯৪১ ব্রিটিশ রাজ্যের যুদ্ধবিমান ব্যবহারের জরুরি প্রয়োজনে রাতারাতি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর স্থাপিত হয়।
১৯৪২ মে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সর্বপ্রথম পতেঙ্গা বিমন বন্দর ও চট্টগ্রামে বোমা বর্ষিত হয়।
১৯৪৩ মহামন্বম্ভরের কবলে পড়ে চট্টগ্রাম।
১৯৪৫ ব্রিটিশ পাইওনিয়ার কের কাহার পাড়ায় গণ-নির্যাতন চালায়।
১৯৪৭ ভারত বিভাগের ফলে চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৪৭ চট্টগ্রাম শহরের সড়কে প্রথম সাইকেল রিকশার চলাচল আরম্ভ হয় এবং শহরের প্রথম বাস-সার্ভিস চালু হয়।
১৯৪৭ চট্টগ্রাম বাণিজ্য কলেজ-এর কার্যাক্রম শুরু হয়।
১৯৪৮ হজ্বযাত্রীদের জন্য প্রথম চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার শুরু হয়।
১৯৪৯ চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতাল স্থাপিত হয়।
১৯৫১ সিভিল ডিফেন্স বা নাগরিক প্রতিরা সংগঠন গঠিত হয়।
১৯৫১ মার্চ ১৬-১৯: শহরের হরিখোলার মাঠে প্রথমবারের মতো সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৫৩ চট্টগ্রামে ইনফুয়েঞ্জার প্রকোপ দেখা দেয়।
১৯৫৪ ২২ জুন সার্কিট হাউসে জরুরি উপগ্রহ রেডিও স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রথম বেতার সম্প্রচর শুরু হয়।
১৯৫৪ অক্টোবর: সাপ্তাহিক ‘জমানা’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সম্পাদক: মাহবুব-উল আলম।
১৯৫৭ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৭ গার্লস কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৭ নভেম্বর: চট্টগ্রাম আইন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৮ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ স্থাপিত হয়।
১৯৫৮ চিটাগাং জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। সভাপতি হন মাহবুব-উল আলম।
১৯৫৯ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়।
১৯৫৯ বন্দর হাসপাতাল স্থাপিত হয়।
১৯৬০ ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে নজরুল হীরক জয়ন্তী উদযাপিত হয়।
১৯৬০ ১ জুলাই: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপ গঠিত হয়।
১৯৬০ সেপ্টেম্বর ৫: দৈনিক আজাদী প্রথম প্রকাশিত হয়।
১৯৬০ প্রলয়ংকরী মহাঘুর্ণিঝড়ে বিপুল জানমালের ক্ষতি হয়।
১৯৬১ সেন্ট্র প্লাসিডস স্কুল প্রাঙ্গণে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উযাপিত হয়।
১৯৬২ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়।
১৯৬২ অটোরিকশা (বেবিট্যাক্সি) প্রথম চালূ হয়।
১৯৬২ সেপ্টেম্বর ৩: মেরিন একাডেমি স্থাপিত হয।
১৯৬২ জুলাই: চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হয়।
১৯৬৩ লায়ন্স দাতব্য চুক্ষু হাসপাতাল স্থাপিত হয়।
১৯৬৩ মার্চ ১: আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়।
১৯৬৩ নভেম্বর: পানি ও পয়:নিঙ্কাশন কর্তৃপ (ওয়াসা) গঠিত হয়।
১৯৬৩ ডিসেম্বর ২০: চট্টগ্রাম গণ-গ্রস্থাগারের কার্যক্রম শুরু হয়।
১৯৬৪ এপ্রিল ১০: মুসলিম হলে কবিয়াল রমেশ শীলকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ৪৫৮টি দোকান বিশিষ্ট চট্টগ্রাম বিপনি বিতান বা নিউমার্কেট চালু হল।
১৯৬৫: জাতিতাত্ত্বিক যাদুঘর স্থাপিত হয়।
১৯৬৫: ফৌজদারহাট যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৬৬ নভেম্বর ১৮: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
১৯৭১ মার্চ ২৩-২৪: সোয়াত জাহাজ থেকে পাকিস্তানি অস্ত্র নামানোর বিরুদ্ধে শ্রমিক জনতার রক্তয়ী প্রতিরোধ।
১৯৭১ ২৬ মার্চ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালূ হয়।
১৯৭৯ চট্টগ্রাম শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮০ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন পরিচালিত ইসলামিক পাঠাগার স্থাপিত হয়।
১৯৮১ ৩০ মে: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুথানকরীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
১৯৮৩ চট্টগ্রামে দেশের প্রথম রপ্তনি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপিত হয়।
১৯৮৮ জানুয়ারী ২৪: ম্বৈরাচার বিরোধী গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার মিছিলে জঙ্গি পুলিশের অবিরাম গুলিবর্ষণে ঘৃণ্যতম বর্বর গণহত্যা সংঘটিত হয়। এত প্রাণ হারান ২২ জন এবং আহত হন পাঁচ শতাধিক।
১৯৮৯ ফেব্রুয়ারী ২৮: চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা চালু হয়।
১৯৮৯ ডিসেম্বর: বাংলাদেশের প্রথম বিজয় মেলার সূচনা হয় চট্টগ্রামে।
১৯৯০ জুলাই ৩১: চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত। বাংলাদেশের প্রথম বিজয় মেলার সূচনা হয় চট্টগ্রামে।
১৯৯১ এপ্রিল ২৯: শতাব্দীর ভয়াবহতম প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের কবলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চল। ১ ল ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং শত শত কোটি টাকার সম্পদ হানি হয়।
১৯৯৩ সেপ্টেম্বর ৬: চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া স্মৃতি যাদুঘর উদ্বোধন করা হয়।
১৯৯৪ নভেম্বর ২৮: চট্টগ্রাম শিশুপার্ক উদ্বোধন করা হয়।

 

 

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া